বিজ্ঞাপন
১৬ বছর মানসিক হাসপাতালে, সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১২ এএম
বিজ্ঞাপন
১৬ বছর পরিবারের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে গুনতে অবশেষে চিরবিদায় নিলেন নাইমা চৌধুরী (৪২)। সোমবার পাবনা মানসিক হাসপাতালের নির্জন কক্ষে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর চার দিন অতিবাহিত হলেও নাইমার লাশ নিতে আসেনি কেউ। বর্তমানে হাসপাতালের হিমঘরে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়ার অপেক্ষায় নাইমা।
হাসপাতালের নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে নাইমা চৌধুরীকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেন তার স্বজনরা। ভর্তির সময় প্রাণবন্ত ও সুন্দরী এ তরুণী সিজোফ্রোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। শুরুর দিকে পরিবার বা স্বজনরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাইমা হয়ে উঠেন তাদের কাছে বোঝা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবারের কেউ তাঁর কোনো খোঁজ নেয়নি। নাইমার শারীরিক অবস্থা এক সময় স্থিতিশীল হলেও পরিবারের অনাগ্রহের কারণে তাঁর আর বাড়ি ফেরা হয়নি।
দীর্ঘদিন হাসপাতালে বন্দির মতো জীবন কাটানোয় এক সময় মানসিক অবসাদ ও শারীরিক জটিলতা তাকে গ্রাস করে। গায়ের উজ্জ্বল রং ফিকে হয়ে যায়, কমতে থাকে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা। শেষ কয়েক বছর তিনি ঠিকমতো খাবার খেতে চাইতেন না। নার্সরা জোর করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন। স্বজনদের উদাসীনতায় একপ্রকার বিনা চিকিৎসায় ও অনাদরেই তাঁর মৃত্যু হলো। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ সেলিম মোরশেদ জানান, নাইমার মৃত্যুর পর তাঁর ফাইলে থাকা বড় ভাইয়ের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ঢাকার কেরানীগঞ্জের দেওয়া ঠিকানায় খোঁজ নিয়েও তাদের হদিস মেলেনি। ধারণা করা হচ্ছে, পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে অনেক আগেই তারা এলাকা ছেড়েছেন।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, পুলিশের মাধ্যমে স্বজনদের খোঁজা হচ্ছে। আমরা শনিবার পর্যন্ত দেখব। এর মধ্যে কারও কোনো খোঁজ না পেলে আমাদের মতো করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ইতিপূর্বেও এসব রোগীদের বিষয়ে আমরা স্ব স্ব জেলা প্রশাসক বা স্থানীয় থানার মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করেও তাদের পরিবারের খোঁজ পাইনি। তিনি আরও বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালে নাইমার মতো আরও অন্তত ছয়জন রোগী আছেন, যাদের পরিবারের কোনো খোঁজ নেই। তার মধ্যে ৬৫ বছর বয়সি সাইদ হোসেন আজও শিশুর মতো ডুকরে কাঁদেন বাড়ি যাওয়ার জন্য। তার বাড়ির লোকজনের কোনো খোঁজ আমরা পাইনি। একইভাবে শিপ্রা রানী, গোলজার বিবি ও শাহানারা আক্তাররা হাসপাতালে এসেছিলেন যৌবনে অসুস্থ হয়ে অভিভাবকদের হাত ধরে, এখন তারা বার্ধক্যে উপনীত। আক্ষেপের সুরে ডা. শাফকাত বলেন, মানসিক রোগকে পাগল হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এ প্রবণতা নাইমার মতো শত শত মানুষের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। নাইমা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন একরাশ প্রশ্ন। রক্ত ও মাংসে গড়া স্বজনরা কেন এত নিষ্ঠুর হয়।
বিজ্ঞাপন