Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

সারাদেশ

বছরে আয় ১০ হাজার, নির্বাচনী বাজেট ৩০ হাজার

টাকার রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী লড়াই মিজানুর রহমানের

Icon

মো. সামিরুজ্জামান

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

বছরে আয় ১০ হাজার, নির্বাচনী বাজেট ৩০ হাজার

বিজ্ঞাপন

জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানেই যখন কোটি কোটি টাকার ব্যয়, পেশিশক্তির প্রদর্শন আর জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা—ঠিক সেই বাস্তবতায় একেবারে ভিন্ন ছবি দেখা যাচ্ছে ভোলা-১ (সদর) আসনে। এখানে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান বার্ষিক মাত্র ১০ হাজার টাকা আয় নিয়ে এবং ৩০ হাজার টাকার সীমিত বাজেটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রতীক ‘আম’।

মিজানুর রহমানের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামা ও আয়কর বিবরণী অনুযায়ী, টিউশনি করে তাঁর বার্ষিক আয় ১০ হাজার টাকা। নিজের নামে নেই কোনো জমি। বাবার তিন শতাংশ পৈতৃক জমির ওপর নির্মিত আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি কাঁচা ঘরই তাঁর একমাত্র স্থাবর সম্পদ। নির্বাচনী ব্যয় হিসেবেও তিনি উল্লেখ করেছেন মাত্র ৩০ হাজার টাকা। ভোলা জেলার চারটি সংসদীয় আসনের ২৪ জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে আয় ও সম্পদের দিক থেকে তিনিই সবচেয়ে কম। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলার তথ্যও নেই।

ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চরকালী গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান পেশায় গৃহশিক্ষক ও কবি। তিনি পল্লিচিকিৎসক শাহ আলমের ছেলে। ১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া মিজান ২০০৫ সালে এসএসসি পাস করেন। ২০০৭ সালে দেশপ্রেমের টানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে নাবিক হিসেবে যোগ দিলেও কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন তাঁর সাহিত্যপ্রবণ মনকে টানতে পারেনি। দীর্ঘ ১২ বছর পর ২০১৯ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর থেকেই কবিতা লেখার পাশাপাশি গ্রামের শিশুদের পড়িয়ে জীবনযাপন করছেন।

ব্যক্তিজীবনেও সংগ্রামপথ তাঁর নিত্যসঙ্গী। দারিদ্র্যের কারণে ২০১৯ সালেই স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান—যা মিজানের জীবনের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেন।

এর আগেও নির্বাচনী রাজনীতিতে নেমে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন মিজানুর রহমান। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ভোটারের স্বাক্ষর সংক্রান্ত জটিলতায় তা বাতিল হয়। তাঁর অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের চাপে তাঁকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে অংশ নিয়ে চমক দেখান তিনি। কোনো বড় প্রচার ছাড়াই ২৬ হাজার ৩১৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। সেই জনসমর্থনই তাঁকে আবার সংসদ নির্বাচনে লড়াইয়ে নামতে অনুপ্রাণিত করেছে।

মিজানুর রহমান বলেন, প্রার্থী হওয়ার পরই কেবল আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে গত ডিসেম্বরে একটি ব্যাংক হিসাব খুলেছেন এবং টিআইএন গ্রহণ করে আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘বর্তমান বাস্তবতায় টাকা ও পেশিশক্তি ছাড়া নির্বাচনে জয়ী হওয়া খুবই কঠিন। যারা এসব শক্তি ব্যবহার করে নির্বাচিত হন, তারা পরে সাধারণ মানুষের কথা বলেন না।’

প্রচারণার ক্ষেত্রেও ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন এই প্রার্থী। তিনি জানান, কোনো পোস্টার-ব্যানার বা বিশাল মিছিল করবেন না। নিজের ও বন্ধু-স্বজনদের সহায়তায় জোগাড় করা ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কেবল লিফলেট ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে যাবেন। তাঁর ভাষায়, ‘এটা মাফিয়া বনাম সাধারণ মানুষের লড়াই।’

ভোলা জেলার চারটি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র হয়েও সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন মিজানুর রহমান। তাঁর দাবি, নির্বাচিত হতে পারলে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সংসদে সোচ্চার হবেন। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বাস্তব সমস্যা সমাধানের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন তিনি।

টাকার রাজনীতির ভিড়ে কবি মিজানুর রহমান কতটা এগোতে পারবেন—সে প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়ই। তবে ভোলা-১ আসনের নির্বাচনী মাঠে তাঁর উপস্থিতি ইতোমধ্যেই একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার