স্বেচ্ছাশ্রমে বদলে যাওয়া এক গ্রামের গল্প
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০৯ পিএম
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সায়দাবাদ ঘাট থেকে বকবান্ধা ব্যাপারীপাড়া গ্রাম। নদীপথে যেতে লাগে প্রায় ৪০ মিনিট। সড়কপথে বকবান্ধা ব্যাপারীপাড়া যাওয়ার উপায় নেই। ভারতের আসাম রাজ্য থেকে বাংলাদেশে ঢুকে জিঞ্জিরাম নদী এখানে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে। দুই তীরে সরিষা, মাসকলাই আর ভুট্টার ক্ষেত বাতাসে দুলছে। নদীতীরে টাঙানো মাছ ধরার জাল বলে দিচ্ছে এখানকার মানুষের জীবনের প্রধান নির্ভরতা এই নদীই। কিন্তু এই শান্ত সৌন্দর্যের ভেতর লুকিয়ে আছে ভয়ও।
জানা গেছে, উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের বকবান্ধা গ্রামের মানুষ কৃষি, মাছ সংগ্রহ ও দিনমজুরির আয়ে সংসার চালায়। কিন্তু পাহাড়ি ঢল নেমে এলেই ভাটিতে জিঞ্জিরাম আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তখন ভাঙনে হারিয়ে যায় ঘরবাড়ি, জমিজমা এবং বছরজুড়ে টিকে থাকার শেষ সম্বলটুকুও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ে বৃষ্টির প্রবণতা বেড়ে গেছে। নদীর স্রোত আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। তীরের মাটি আগের তুলনায় দ্রুত ক্ষয়প্রবণ। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও দ্রুত পানি বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে পাহাড়ি ঢল আরও বাড়বে। ফলে অস্থায়ী উদ্যোগের পাশাপাশি স্থায়ী নদী তীর সুরক্ষা বাঁধ প্রয়োজন। এছাড়া আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।
এদিকে নদীভাঙন বকবান্ধা গ্রামের মানুষের কাছে নতুন নয়। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া এক প্রচেষ্টা বদলে দিয়েছে তীরের মানুষের ভাবনা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশের ট্রোসা-২ প্রকল্পের সহায়তায় নদী তীরের নারী-পুরুষ, বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ একসঙ্গে বসে ‘নদী বৈঠক’ করেন। আলোচনা শেষে বড় বাঁধ নয় বরং দ্রুত কার্যকর ও স্বল্প খরচের সমাধান বিবেচনায় নেওয়া হয় বাঁশের বান্ডাল তৈরির সিদ্ধান্ত।
পরে স্থানীয়দের চাঁদার টাকা, ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তা এবং প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৬০০ মিটার এলাকায় ২৭টি বাঁশের বান্ডাল স্থাপন করা হয়। বান্ডালগুলো স্রোতকে মাঝপথে প্রতিহত করে তীরের চাপ কমায়।
কিন্তু নৌযান চলাচল, বর্ষার অতিরিক্ত পানির স্রোত ও উজানের পাহাড়ি ঢলের তীব্রতার কারণে স্থানীয়দের বুঝতে দেরি হয়নি শুধু বান্ডালই বকবান্ধার ভাঙন ঠেকাতে যথেষ্ট নয়। গত ৪ জুন স্থানীয় ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে জিও ব্যাগের জন্য লিখিত আবেদন জমা দেয়। পরে জুলাই মাসে বকবান্ধায় জিও ব্যাগ সরবরাহ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্বেচ্ছাশ্রমে স্থানীয় বাসিন্দারা এগুলো দিয়ে বান্ডালের পাশেই আরও মজবুত সুরক্ষা তৈরি করেন।
কথা হয় ওই এলাকার আনুজা বেগমের (৫০) সঙ্গে। তিনি জানান, জিঞ্জিরামের ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে এলাকার মানুষ সকলেই চাঁদা দিয়েছে, স্বেচ্ছায় কাজ করেছে। বাঁশের ৬০০ মিটার বান্ডালে অন্তত ৪০০ পরিবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
আনুজা বেগম আরও বলেন, ‘ধনি-গরীব সব ঘর থেইকা টাকা তুলছি। ১০ টাকা হোক আর হাজার টাকা। এভাবে ৫০ হাজার টাকা ওঠে। পরে ইউনিয়ন পরিষদ এক লাখ টাকা দেয়। মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে বান্ডাল বানাইছে।’
বকবান্ধা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা গুলু মিয়া (৭০) বলেন, ‘এই নদী পাড়ে আমার বাপ-দাদার ১০ বিঘা জমি আছিল। ভাঙতে ভাঙতে এহন বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নাই। বান্ডাল দেওয়ার পর এ বছর আর ভাঙে নাই।’
স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, স্থায়ী বাঁধ না হওয়ায় বকবান্ধা নামাপাড়া ও ব্যাপারীপাড়ার অন্তত চার শতাধিক পরিবার এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় বাজার, দুটি মসজিদ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থান হুমকির মুখে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ময়নাল হক বলেন, ‘উজানে ভারী বৃষ্টি মানেই ভাটিতে আমাগো দুশ্চিন্তা। গত বছর ঢলের স্রোত খুব তীব্র আছিল। বান্ডাল না দিলে এই এলাকা রাইখা দিত না। কিন্তু স্থায়ী বাঁধ দরকার।’
ট্রোসা-২ প্রকল্পের সহকারী কর্মকর্তা আবদুর রহিম খন্দকার বলেন, ‘এলাকাবাসী নদীভাঙন রোধে বাঁশের বান্ডাল তৈরির কাজ শুরু করে। আমরা টেকসই করতে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছি।’
তবে স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী নদীতীর সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে ভাঙন আবার ফিরে আসবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘রৌমারীতে জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙন রোধে এলাকাবাসী জিও ব্যাগ চেয়ে আবেদন করে। পরে আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে স্থানীয় মানুষের চাহিদার প্রেক্ষিত জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ সরবরাহ করি। স্থানীয় মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে সেখানে জিও ব্যাগ ও বাঁশ দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করেছে।’
জানা গেছে, উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের বকবান্ধা গ্রামের মানুষ কৃষি, মাছ সংগ্রহ ও দিনমজুরির আয়ে সংসার চালায়। কিন্তু পাহাড়ি ঢল নেমে এলেই ভাটিতে জিঞ্জিরাম আগ্রাসী হয়ে ওঠে। তখন ভাঙনে হারিয়ে যায় ঘরবাড়ি, জমিজমা এবং বছরজুড়ে টিকে থাকার শেষ সম্বলটুকুও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ে বৃষ্টির প্রবণতা বেড়ে গেছে। নদীর স্রোত আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। তীরের মাটি আগের তুলনায় দ্রুত ক্ষয়প্রবণ। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেও দ্রুত পানি বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে পাহাড়ি ঢল আরও বাড়বে। ফলে অস্থায়ী উদ্যোগের পাশাপাশি স্থায়ী নদী তীর সুরক্ষা বাঁধ প্রয়োজন। এছাড়া আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।
এদিকে নদীভাঙন বকবান্ধা গ্রামের মানুষের কাছে নতুন নয়। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া এক প্রচেষ্টা বদলে দিয়েছে তীরের মানুষের ভাবনা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশের ট্রোসা-২ প্রকল্পের সহায়তায় নদী তীরের নারী-পুরুষ, বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ একসঙ্গে বসে ‘নদী বৈঠক’ করেন। আলোচনা শেষে বড় বাঁধ নয় বরং দ্রুত কার্যকর ও স্বল্প খরচের সমাধান বিবেচনায় নেওয়া হয় বাঁশের বান্ডাল তৈরির সিদ্ধান্ত।
পরে স্থানীয়দের চাঁদার টাকা, ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তা এবং প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৬০০ মিটার এলাকায় ২৭টি বাঁশের বান্ডাল স্থাপন করা হয়। বান্ডালগুলো স্রোতকে মাঝপথে প্রতিহত করে তীরের চাপ কমায়।
কিন্তু নৌযান চলাচল, বর্ষার অতিরিক্ত পানির স্রোত ও উজানের পাহাড়ি ঢলের তীব্রতার কারণে স্থানীয়দের বুঝতে দেরি হয়নি শুধু বান্ডালই বকবান্ধার ভাঙন ঠেকাতে যথেষ্ট নয়। গত ৪ জুন স্থানীয় ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে জিও ব্যাগের জন্য লিখিত আবেদন জমা দেয়। পরে জুলাই মাসে বকবান্ধায় জিও ব্যাগ সরবরাহ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্বেচ্ছাশ্রমে স্থানীয় বাসিন্দারা এগুলো দিয়ে বান্ডালের পাশেই আরও মজবুত সুরক্ষা তৈরি করেন।
কথা হয় ওই এলাকার আনুজা বেগমের (৫০) সঙ্গে। তিনি জানান, জিঞ্জিরামের ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে এলাকার মানুষ সকলেই চাঁদা দিয়েছে, স্বেচ্ছায় কাজ করেছে। বাঁশের ৬০০ মিটার বান্ডালে অন্তত ৪০০ পরিবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
আনুজা বেগম আরও বলেন, ‘ধনি-গরীব সব ঘর থেইকা টাকা তুলছি। ১০ টাকা হোক আর হাজার টাকা। এভাবে ৫০ হাজার টাকা ওঠে। পরে ইউনিয়ন পরিষদ এক লাখ টাকা দেয়। মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে বান্ডাল বানাইছে।’
বকবান্ধা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা গুলু মিয়া (৭০) বলেন, ‘এই নদী পাড়ে আমার বাপ-দাদার ১০ বিঘা জমি আছিল। ভাঙতে ভাঙতে এহন বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নাই। বান্ডাল দেওয়ার পর এ বছর আর ভাঙে নাই।’
স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, স্থায়ী বাঁধ না হওয়ায় বকবান্ধা নামাপাড়া ও ব্যাপারীপাড়ার অন্তত চার শতাধিক পরিবার এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় বাজার, দুটি মসজিদ, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থান হুমকির মুখে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ময়নাল হক বলেন, ‘উজানে ভারী বৃষ্টি মানেই ভাটিতে আমাগো দুশ্চিন্তা। গত বছর ঢলের স্রোত খুব তীব্র আছিল। বান্ডাল না দিলে এই এলাকা রাইখা দিত না। কিন্তু স্থায়ী বাঁধ দরকার।’
ট্রোসা-২ প্রকল্পের সহকারী কর্মকর্তা আবদুর রহিম খন্দকার বলেন, ‘এলাকাবাসী নদীভাঙন রোধে বাঁশের বান্ডাল তৈরির কাজ শুরু করে। আমরা টেকসই করতে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছি।’
তবে স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী নদীতীর সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে ভাঙন আবার ফিরে আসবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘রৌমারীতে জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙন রোধে এলাকাবাসী জিও ব্যাগ চেয়ে আবেদন করে। পরে আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে স্থানীয় মানুষের চাহিদার প্রেক্ষিত জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ সরবরাহ করি। স্থানীয় মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে সেখানে জিও ব্যাগ ও বাঁশ দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করেছে।’