বিজ্ঞাপন
আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:১১ পিএম
বিজ্ঞাপন
সদ্য বিদায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক বিধি লঙ্ঘন ও স্বার্থের সংঘাতের একাধিক অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা ও সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে— এমন অভিযোগ তুলে বিষয়গুলো তদন্তে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
কাউন্সিলের পক্ষ থেকে গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সাতটি বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিএফআইইউ তথ্যপাচারের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়, গভর্নর সচিবালয় থেকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটক (বিএফআইইউ) নিয়মিত বিরতিতে ফ্রিজকৃত ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব স্পর্শকাতর তথ্য গভর্নর অফিসে সংরক্ষণের বিধান না থাকলেও তা গভর্নরের পরিবারের সদস্য ও একান্ত সচিবের মাধ্যমে একটি চক্রের কাছে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিনিময়ে বন্ধ হিসাব সচল করার নামে অর্থ লেনদেনেরও অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়ে অনিয়ম
কাউন্সিলের অভিযোগ, সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি ও আট বছরের ক্রয়সীমা উপেক্ষা করে প্রায় দুই কোটি টাকার বিলাসবহুল ে‘টয়োটা আলফার্ড’ গাড়ি কেনা হয়েছে। সাবেক গভর্নরের ব্যবহারের জন্য কেনা সচল গাড়ি থাকা সত্ত্বেও নতুন এই গাড়ি ক্রয়ে যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া (পিপিআর) অনুসরণ করা হয়নি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
চারটি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ
গভর্নরের চুক্তি অনুযায়ী দুটি গাড়ি ব্যবহারের অধিকার থাকলেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে চারটি গাড়ি রয়েছে এবং নির্ধারিত জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সীমার বাইরে ব্যয় হচ্ছে— এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে।
পিএসের ভাতা উত্তোলন
গভর্নরের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে কর্মরত অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা অফিসের গাড়ি ব্যবহার করেও মাসে ৫০ হাজার টাকা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এটি বিধিবহির্ভূত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বলে দাবি করা হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সে স্বার্থের সংঘাত
অভিযোগে বলা হয়, গভর্নরের পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স দিতে তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে একক গোষ্ঠীর মালিকানা সীমা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। বোর্ড সভায় কর্মকর্তাদের আপত্তিতে বিষয়টি স্থগিত হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে।
মেডিক্যাল সুবিধা অপব্যবহারের অভিযোগ
ব্যাংকের মেডিক্যাল সেন্টারে ওষুধ মজুত থাকা সত্ত্বেও ‘নো-স্টক’ স্লিপ নিয়ে বাইরে থেকে ওষুধ কেনার নামে বানোয়াট বিলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
সিএসআর তহবিল ব্যবহারে প্রশ্ন
কাউন্সিলের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে নীলফামারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গার খলিল-মালিক ফাউন্ডেশন এবং টাঙ্গাইলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে অনুদান প্রদানে স্বচ্ছতা ও নীতিমালা মানা হয়নি। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা থাকা অবস্থায় অনুদান দেওয়া ‘স্বার্থের সংঘাত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের দাবি
উপরোক্ত অভিযোগগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে উল্লেখ করে কাউন্সিল পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে।
এসব নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আহসান এইচ মনসুরকে। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ড. মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, তদারকি জোরদার এবং নীতিগত সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপে তিনি কঠোর অবস্থান নেন। এতে একদিকে যেমন সংস্কারপন্থিদের সমর্থন পান, অপরদিকে ব্যাংকিং খাতের একটি অংশের অসন্তোষও তৈরি হয়।
সর্বশেষ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ বলে উল্লেখ করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তিন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়। পাশাপাশি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে কয়েকজন কর্মকর্তার বদলিও ঘটে। বিষয়টি ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর মধ্যেই গভর্নর পদে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এলো।
উল্লেখ্য, গণঅভ্যত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব দেওয়ার পর ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে আহসার এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেয়। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতায় আসার নয় দিনের মাথায় বর্তমান গভর্নরের জায়গায় নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে গভর্নরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন