Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

কানাডা থেকে স্বাধীনতা চায় আলবার্টা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১১ পিএম

কানাডা থেকে স্বাধীনতা চায় আলবার্টা

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে এবার নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টার স্বাধীনতাকামী আন্দোলন। বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, যখন সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা আলবার্টাকে কানাডা থেকে আলাদা করতে চাওয়া একটি গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত তিনবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা আলবার্টা প্রস্পেরিটি প্রজেক্ট নামের একটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সংগঠনটি আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে গণভোট আয়োজনের জন্য কাজ করছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘কানাডার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার’ আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ইস্যুতে কার্নির প্রতি কতটুকু আন্তরিক হবেন- তা সময় বলে দেবে।

এরই মধ্যে আলবার্টা প্রস্পেরিটি প্রজেক্টের এক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কাছে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণসুবিধা চাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যাতে ‘স্বাধীন আলবার্টায় রূপান্তর প্রক্রিয়া’ সমর্থন পায়।

তবে হোয়াইট হাউস এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে খাটো করে দেখিয়েছে। সিএনএনকে এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিতই সাক্ষাৎ করেন, তবে এই বৈঠকগুলোতে কোনো ধরনের সমর্থন বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।

এরপরেও কানাডায় এই খবর ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ ও ভূখণ্ড নিয়ে হুমকির মুখে কানাডা যখন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে চাইছে, তখন আলবার্টার স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন।

প্রতিবেশী প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নেতা এই উদ্যোগকে সরাসরি ‘রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন।

আলবার্টা কানাডার পশ্চিমাঞ্চলের একটি তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ, আয়তনে প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সমান। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বাস এই প্রদেশে। রকি পর্বতমালা, ব্যানফ ও লেক লুইসের মতো পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে এখানে। আলবার্টার অর্থনীতি মূলত জ্বালানি ও কৃষি খাতনির্ভর। প্রদেশটির তেল বালু থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল কানাডার মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৪ শতাংশ।

রাজনৈতিকভাবে আলবার্টাকে কানাডার রক্ষণশীলতার ঘাঁটি হিসেবে ধরা হয়, যদিও ক্যালগারি ও এডমন্টনের মতো বড় শহর তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী। প্রদেশটির বর্তমান প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং গত জানুয়ারিতে ট্রাম্পের মার-আ-লাগো ক্লাবেও সফর করেন।

আলবার্টার অনেক বাসিন্দার দীর্ঘদিনের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার অটোয়ায় তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব পায় না। তাদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নামে ফেডারেল সরকারের নীতিমালা আলবার্টার তেল শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তারা ফেডারেল কর বেশি দেয় কিন্তু বিনিময়ে কম পায়, আর তাদের রক্ষণশীল মূল্যবোধ পূর্ব কানাডার বেশি জনবহুল ও উদারপন্থি প্রদেশগুলোর কাছে চাপা পড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘ওয়েস্টার্ন এলিয়েনেশন’ বা পশ্চিমাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি কানাডার ইতিহাসেই পুরোনো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভিড-১৯ লকডাউন, দীর্ঘদিনের লিবারেল শাসন এবং ট্রাম্পবিরোধী জাতীয় ঐক্যের আবহ এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ফেডারেল নির্বাচনে ট্রাম্পবিরোধী আবেগে কার্নির লিবারেল পার্টির জয়ের পর আলবার্টার আইনসভা স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজন সহজ করার একটি আইনও পাস করে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এখনো সংগঠিত বা শক্তিশালী নয়। কোনো স্পষ্ট নেতা নেই, আইনসভায় তাদের কোনো দল আসনও পায়নি। জনমত জরিপেও স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন তুলনামূলকভাবে কম। জানুয়ারিতে করা এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৯ শতাংশ আলবার্টাবাসী কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে।

তবু পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কিছু সংগঠন ইতিমধ্যে গণভোটের দাবিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ করছে। আবার অনেকে বলছেন, গণভোটের পক্ষে থাকা অনেকেই প্রকৃত স্বাধীনতা চান না, বরং অটোয়ার সঙ্গে দরকষাকষিতে আলবার্টার অবস্থান শক্ত করতে প্রতীকী চাপ সৃষ্টি করতে চান।

প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে নন বলে জানিয়েছেন, তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগকে ‘যৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আলবার্টার মানুষের অসন্তোষকে উপেক্ষা করা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনকি যদি কোনো গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় আসে, তবুও কানাডা থেকে আলবার্টার আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া হবে অত্যন্ত জটিল ও অস্থিতিশীল। আলবার্টা স্বাধীন দেশ হবে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হবে- এই প্রশ্নসহ আইনি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বহু বিষয় এখনো অমীমাংসিত।

এসব অনিশ্চয়তার কারণে আলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র- দু’দেশেই উদ্বেগ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার