বিজ্ঞাপন
কেলেঙ্কারি ফাঁস
এপস্টেইনকাণ্ডে তছনছ বহু জীবন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৩ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের পরিচয় শুধু একজন ভয়ংকর যৌন অপরাধী হিসেবেই নয়; তিনি এ কালের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও প্রভাবের অন্ধকার জগতের প্রতীকও হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশ করা ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নতুন নথি এ অন্ধকারকে আরও গভীর করেছে। এ ঘটনায় বহু মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। অনেকের নাম প্রকাশ্যে আসায় সামাজিকভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। কারও সংসার ভেঙেছে। অনেক রথী-মহারথীকে ক্ষমতা বা পদ ছাড়তে হয়েছে, কারোর বাসভবন। কেউবা তদন্তের মুখে পড়েছেন। এপস্টেইনকাণ্ড রীতিমতো বিশ্বব্যাপী সমালোচনা ঝড় তুলেছে।
পরিচয় গোপনের শর্ত লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠায় জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত হাজারো নথি নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে)। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকাশিত নথিতে ত্রুটিপূর্ণ সম্পাদনার (রিডাকশন) কারণে তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগীদের আইনজীবীরা দাবি করেন, গত শুক্রবার প্রকাশিত এপস্টেইন ফাইলে তথ্য গোপনের প্রক্রিয়া ঠিকমতো না হওয়ায় প্রায় ১০০ জনের বেশি ভুক্তভোগীর জীবন ‘ওলটপালট’ হয়ে গেছে। তারা আরও বলেন, প্রকাশিত নথিতে এমন ই-মেইল ঠিকানা ও আপত্তিকর ছবি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল।
এক বিবৃতিতে ভুক্তভোগীরা এ ঘটনাকে ‘চরম আপত্তিকর’ অভিহিত করে জানান, এভাবে তাদের নাম প্রকাশ, যাচাই-বাছাই এবং নতুন করে মানসিক যন্ত্রণার মুখে ফেলা উচিত হয়নি।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, যেসব নথি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভুলগুলো ‘প্রযুক্তিগত’ বা ‘মনুষ্য’ ত্রুটির কারণে হয়েছে বলে দাবি তাদের। সোমবার ফেডারেল বিচারকের কাছে জমা দেওয়া এক চিঠিতে বিভাগটি জানায়, ভুক্তভোগী বা তাদের আইনজীবীদের অনুরোধে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চিহ্নিত সব নথি পরবর্তী সময়ে সংশোধনের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিভাগটি আরও জানায়, নতুন অনুরোধগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং আর কোনো নথি সরানো বা সম্পাদনার প্রয়োজন আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। নিজেদের উদ্যোগে শনাক্ত করা ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক’ নথিও সরানো হয়েছে বলে জানানো হয়।
মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের অনুমোদনের পর বিচার বিভাগ এই নথিগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য ছিল। তবে শর্ত ছিল যে, ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা যায়— এমন সব তথ্য অবশ্যই মুছে ফেলতে বা ঢেকে দিতে হবে।
শুক্রবার ভুক্তভোগীদের পক্ষে দুই আইনজীবী নিউইয়র্কের একজন ফেডারেল বিচারকের কাছে ওয়েবসাইটটি বন্ধের আবেদন জানান। তারা বলেন, এটি এক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তার সবচেয়ে ভয়াবহ লঙ্ঘন।
দুই আইনজীবী ব্রিটানি হেন্ডারসন ও ব্র্যাড এডওয়ার্ডস জানান, বিচার বিভাগ হাজার হাজার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য মুছতে ব্যর্থ হওয়ায় এক ‘জরুরি’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যা তাৎক্ষণিক বিচারিক হস্তক্ষেপ দাবি করে।
বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী ওই চিঠিতে নিজস্ব মন্তব্য দিয়েছেন। একজন একে ‘জীবননাশী’ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আরেক জানান, তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের তথ্য ফাঁস হওয়ায় তিনি প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন।
গত মঙ্গলবার বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভুক্তভোগী অ্যানি ফারমার বলেন, ‘বিচার বিভাগ ভুক্তভোগীদের পরিচয় যেভাবে উন্মুক্ত করে ক্ষতি করেছে, তাতে এই নথির মাধ্যমে বেরিয়ে আসা নতুন তথ্যের ওপর নজর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
আরেক ভুক্তভোগী লিসা ফিলিপস বলেন, প্রকাশের ফল নিয়ে অনেকেই ‘খুবই অসন্তুষ্ট’। বিচার বিভাগ আমাদের তিনটি শর্তই লঙ্ঘন করেছে—এক, অনেক নথিই এখনো প্রকাশ হয়নি। দুই, প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তিন, ডিওজে বহু ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমাদের সঙ্গে গেম খেলা হচ্ছে; কিন্তু আমরা লড়াই থামাব না।’
এপস্টেইনের বহু ভুক্তভোগীর পক্ষে লড়েছেন নারীবাদী আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড। তিনি বিবিসিকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের নামের ওপর কেবল একটি দাগ টেনে দেওয়া হয়েছে যা থেকে সহজেই নাম পড়া যাচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এমন সব ভুক্তভোগীর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যারা কখনো প্রকাশ্যে সাক্ষাৎকার দেননি, কখনো নামও প্রকাশ করেননি।
ডিওজের এক মুখপাত্র বলেন, তারা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। নির্দোষদের রক্ষায় প্রকাশিত লাখো পাতার মধ্যে হাজার হাজার ভুক্তভোগীর নাম সরানো হয়েছে।
গত বছর আইন করে নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক হওয়ার পর থেকে মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩০ লাখ পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও, যার একটি বড় অংশ গত শুক্রবার প্রকাশিত হয়।
বিচার শুরুর অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারা কক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী এপস্টেইনের মৃত্যু হয়।
এ নথিতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রুর নাম থাকায় রয়েল ফ্যামিলি বিতর্কের মুখে পড়েছে। রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর যুক্তরাজ্যের উইন্ডসর শহরে অবস্থিত রয়্যাল লজ ছেড়ে নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে চলে যান। গত সোমবার রাতে অ্যান্ড্রু রয়্যাল লজ ছাড়েন। এর আগে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন যে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে তাকে বাধ্য করেছিলেন এপস্টেইন।
সরকারি কার্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগে সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটন পুলিশ।
এমন সময়ে এ তদন্ত শুরু হলো যখন কি না ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে এপস্টেইনকে স্পর্শকাতর সরকারি তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ম্যান্ডেলসন। চাপের মুখে তিনি সংসদীয় পদও ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
এ নথিতে নাম থাকায় নাকি সংসার ভেঙেছিল ধনকুবের বিল গেটসেরও। সম্প্রতি বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস বলেন, এ ঘটনায় সাবেক স্বামী বিল গেটসের সঙ্গে তার বিবাহিত জীবনে কাটানো যন্ত্রণাদায়ক সময়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সব সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলাম বলে আমার খুবই স্বস্তি হচ্ছে।’
এ কেলেঙ্কারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক, সাবেক বিল ক্লিনটনের নাম জড়িয়েছে। এতদিন ক্লিনটন এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বরাবরই জানিয়ে আসছিলেন, তিনি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানতেন না এবং তার সঙ্গে সম্পর্কের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এখন এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হয়েছেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
বিজ্ঞাপন