বিজ্ঞাপন
সৌদি আরব কেন লাখো উটকে পাসপোর্ট দেবে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
সৌদি আরবের লাখ লাখ উটের জন্য পাসপোর্ট তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুয়ায়ী, এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটির মূল্যবান প্রাণিগুলোর আরো ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন, এ পদক্ষেপ উট পালন খাতকে আরো কার্যকর করে তুলবে এবং উটগুলোর পরিচয় ও মালিকানা সংক্রান্ত একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি করবে।
সৌদি সরকারের পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে এই নথির ছবিও দেখিয়েছে। সেখানে সবুজ রঙের একটি পাসপোর্ট দেখা যায়, যার ওপর আছে দেশের প্রতীক এবং সোনালি রঙের একটি উটের ছবি।
২০২৪ সালে সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সৌদিতে প্রায় ২২ লাখ উট আছে, যা প্রতি বছর দেশটির অর্থনীতিতে দুই বিলিয়ন রিয়ালের বেশি অবদান রাখছে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন কোটি উট আছে, যার মধ্যে এক কোটি সত্তর লাখ আরব বিশ্বে। আরব দেশগুলোর মধ্যে উটের সংখ্যায় শীর্ষে আছে সোমালিয়া। এরপর আছে সুদান, মৌরিতানিয়া, সৌদি ও ইয়েমেন।
উট সৌদির জাতীয় প্রতীকের অংশ। দেশটিতে এ প্রাণির সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়, যেখানে সেরা উটগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়।
জাতীয়, বিশেষ ও ঐতিহাসিক দিবস উপলক্ষে সৌদির আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী উটের উপস্থিতি ছাড়া যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
সৌদি ও সামগ্রিকভাবে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে উটের ভূমিকার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ শতকের শুরুর দিকে উটই ছিল ইসলামের পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এমনকি সুদূর পূর্বাঞ্চল থেকে আসা হাজি ও হাজি কাফেলাগুলো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উটের পিঠে করেই সৌদি আরবে পৌঁছাতেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের শুষ্ক মরুভূমিতে পরিবহনের জন্য উট ব্যবহারের ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী পুরোনো।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সৌদি আরবে পাথরে খোদাই করা উটের ভাস্কর্যগুলো বিশ্বে পশুপাখি নিয়ে আঁকা প্রাচীনতম চিত্র হতে পারে।
২০১৮ সালে প্রথম এগুলো খনন করে বের করার সময় গবেষকেরা ধারণা করেছিলেন, সেগুলো প্রায় দুই হাজার বছর আগে নির্মিত।
জর্ডানের প্রাচীন নগরী পেত্রায় পাওয়া নিদর্শনের সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে এ অনুমান করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী গবেষণায় এসব উটের ছবির বয়স সাত থেকে আট হাজার বছর বলে নির্ধারণ করা হয়।
পাথরের খোদাইয়ের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা গবেষকদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কারণ, গুহাচিত্রের মতো এখানে সাধারণত কোনো জৈব উপাদান পাওয়া যায় না, যা পরীক্ষা করা সম্ভব। এ অঞ্চলে এত উচ্চমানের শিলাচিত্র পাওয়া যাওয়াও বিরল।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে তাদের গবেষণার ফল প্রকাশ করে।
তারা ভাস্কর্যগুলোর ভাঙনের ধরন, বিভিন্ন চিহ্ন এবং ওই এলাকায় পাওয়া প্রাণীর হাড় বিশ্লেষণ করে নতুন করে এগুলোর বয়স নির্ধারণ করেন।
এই স্মৃতিস্তম্ভগুলোর প্রাচীনত্ব এমন যে, সেগুলো পাঁচ হাজার বছর পুরোনো প্রস্তর যুগেরও আগের, কিংবা মিসরের গিজার পিরামিডের চেয়েও পুরোনো হতে পারে, যেগুলোর বয়স প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর।
স্মৃতিস্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন উট গৃহপালিত হয়নি। অথচ পরবর্তী সময়ে উট পালন এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
যখন এসব ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছিল, তখনকার সৌদি আজকের মতো ছিল না। বর্তমানের মরুভূমির জায়গায় তখন ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ ও ঘাসে ভরা এলাকা, সঙ্গে ছিল হ্রদ।
উটের ভাস্কর্যগুলো কেন তৈরি করা হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকদের ধারণা, এগুলো যাযাবর গোত্রগুলোর মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
রিয়াদ পত্রিকার কলাম লেখক ও সৌদি ইতিহাসবিদ ড. বদর বিন সৌদ বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরব উপদ্বীপের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে উট। তিনি বলেন, ‘উট ছাড়া এই শুষ্ক ও প্রচণ্ড গরম মরুভূমিতে টিকে থাকা অসম্ভব হতো।’
এই প্রয়োজন থেকেই আরব বিশ্বে অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে উটের ভূমিকা গড়ে ওঠে।
বদর বিদ সৌদের ভাষায়, ‘ইসলাম-পূর্ব যুগে তারফা ইবনে আল-আব্দের মতো কবিরা তাদের কবিতায় উটের কথা উল্লেখ করেছেন। মানুষের জীবনে উট এমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে যে একে উপেক্ষা করা যায় না। এ কারণেই ইসলামের নবীরও (সা.) একটি উট ছিল, যার নাম ছিল কাসওয়া।’
যদিও পরিবহনের ক্ষেত্রে উটের প্রয়োজন এখন অনেকটাই কমে গেছে, তবুও আরব নেতাদের সঙ্গে উটের ভালোবাসা এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক এখনো অটুট আছে।
আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের 'আল-রামাআত' নামে একটি উটের পাল ছিল এবং একটি বিশেষ উট ছিল, যার নাম 'আল-দুয়াইলা'। বাদশাহ সালমানও উটের বড় ভক্ত।
বদর বিন সৌদ বলেন, ‘একবার বাদশাহ প্রিন্স সৌদ বিন মুহাম্মদকে অনুরোধ করেছিলেন, তার সুন্দর একটি উট (মানকিয়্যা) পাঠানোর জন্য। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানেরও 'আল-শরফ' নামে একটি সুন্দর ও উন্নত জাতের উট আছে।"
উটকে 'মরুভূমির জাহাজ' বলা হয়, কারণ একটি উট ৪০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত বোঝা বহন করতে পারে।
গাড়ি ও অন্যান্য আধুনিক পরিবহনের অভাবে মক্কার কুরাইশ নেতাদের কাফেলাগুলো উটে চড়েই সিরিয়া ও ইয়েমেনে যাতায়াত করতেন।
৪০০ বছর আগে 'ইকলাত' নামে পরিচিত ব্যবসায়ীরা ভারত, তুরস্ক, মরক্কো ও নাইজেরিয়ার মতো দূরবর্তী দেশ পর্যন্ত উটের বাণিজ্য করতেন।
এমনকি কয়েক দশক আগেও তেল উত্তোলন ও পরিশোধনের কাজে উট ব্যবহার করা হতো।
রঙের ভিত্তিতে উটকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। উটের রং বাদামি থেকে লালচে পর্যন্ত হয়ে থাকে।
উট বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমান ও সুদানের উট দৌড়ানোর সক্ষমতার জন্য পরিচিত, আর সৌদির উপকূলীয় অঞ্চলের উট পরিচিত তাদের বেশি দুধ উৎপাদনের জন্য।
বিশ্বের প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক যুগের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সৌদি আরব এখন যে বিপুল বিনিয়োগ করছে, সেই প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই দেশটি উটের ঐতিহাসিক মূল্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে 'স্বানি' নামের একটি প্রতিষ্ঠান উটের দুধ ও দুধের গুঁড়া শিল্পে বিনিয়োগ করছে এবং এরই মধ্যে ২৫টি দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি করেছে। তারা উটের দুধ দিয়ে আইসক্রিমও তৈরি করছে।
'আবেল' ব্র্যান্ড উটের লোম ও চামড়া দিয়ে পোশাক, হাতে তৈরি ব্যাগ এবং জুতা তৈরি করে।
কুমিরের চামড়ার পর উটের চামড়াকেই সবচেয়ে শক্ত ও টেকসই হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর আওতায় উট শিল্প দেশটির তেলবহির্ভূত প্রধান আয়ের উৎসগুলোর একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। আয়ের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতিনীতি—যা সৌদিদের জন্য একই সঙ্গে লাভজনক এবং গর্বেরও বিষয়।
বিজ্ঞাপন
