Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

‘মোজাইক ডিফেন্স’: দীর্ঘ যুদ্ধে ইরানের এক গোপন কৌশল

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

‘মোজাইক ডিফেন্স’:  দীর্ঘ যুদ্ধে ইরানের এক গোপন কৌশল

বিজ্ঞাপন

ইরান দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলো বিশ্লেষণ করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যাতে রাজধানী তেহরান বোমা হামলার শিকার হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এমনটি জানিয়েছেন। 

তার এই বক্তব্য শুধু স্থিতিশীলতার কথা নয়; বরং ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির মূল যুক্তিটাই তুলে ধরে। 

তেহরানের এই নীতির কেন্দ্রে এমন একটি ধারণা আছে, যাকে ইরানি সামরিক বিশ্লেষকেরা বলেন ‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’। এর মূল ধারণা হলো—যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান হয়তো শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এমনকি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণও হারাতে পারে। তবু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

অর্থাৎ শুধু তেহরানকে কিংবা সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে রক্ষা করা একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। মূল লক্ষ্য হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, যুদ্ধরত ইউনিটগুলোকে সক্রিয় রাখা এবং একটি বড় হামলার মাধ্যমে যাতে যুদ্ধ হঠাৎ শেষ হয়ে না যায় তা নিশ্চিত করা।

এ কারণেই ইরানের সামরিক কাঠামো স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য তৈরি করা হয়েছে।

মোজাইক ডিফেন্স কী?

‘মোজাইক ডিফেন্স’ মূলত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সামরিক ধারণা। বিশেষ করে সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জাফরি (২০০৭–২০১৯) এই ধারণাকে জোরালোভাবে এগিয়ে নেন।

এই কৌশলে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে একক কমান্ডের অধীনে না রেখে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আংশিক স্বাধীন স্তরে ভাগ করা হয়। ফলে কোনো বড় হামলায় একটি কমান্ড ধ্বংস হলেও পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে না।

আরও পড়ুন
এই ব্যবস্থায় আইআরজিসি, বাসিজ, নিয়মিত সেনাবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী এবং স্থানীয় কমান্ড—সবাই একটি ছড়ানো নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করে।

যদি কোনো অংশ ধ্বংস হয়, অন্য অংশগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। যদি শীর্ষ নেতা নিহত হন, তবুও কমান্ড কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে।

এই নীতির দুটি প্রধান লক্ষ্য আছে—

১. ইরানের কমান্ড ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা কঠিন করে তোলা

২. যুদ্ধক্ষেত্রকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাতে দ্রুত ফলাফল নির্ধারণ করা কঠিন হয়

কেন এই কৌশল গ্রহণ করল ইরান?

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে আগ্রাসন এবং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ইরানের কৌশলগত চিন্তায় বড় প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে সাদ্দাম হোসেনের শাসন খুব দ্রুত ভেঙে পড়া ইরানের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। তারা দেখেছিল, একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র কাঠামো কীভাবে মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে দ্রুত ধসে পড়ে।

ফলে ইরান বিপরীত পথে হাঁটে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর বদলে তারা ক্ষমতা ছড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন
যুদ্ধের সময় এটি কীভাবে কাজ করে?

এই কৌশল অনুযায়ী বিভিন্ন বাহিনীর আলাদা ভূমিকা রয়েছে। ইরানের নিয়মিন সেনাবাহিনী ‘আরতেশ’ প্রথম আঘাত সামলানোর দায়িত্ব পায়। তাদের ট্যাংক, যান্ত্রিক ইউনিট ও পদাতিক বাহিনী শত্রুর অগ্রগতি ধীর করার চেষ্টা করবে।

বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ছদ্মবেশ, বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্ন অবস্থান ব্যবহার করে শত্রুর আকাশ শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করবে।

এরপর আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনী যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত করবে—হামলা, ওঁত পেতে আক্রমণ, সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত করা এবং স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে।

বাসিজ বাহিনী এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইরান বিপ্লবের নেতা রুহুল্লা খোমেনি। পরে এটি আইআরজিসির কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।

২০০৭ সালের পর বাসিজ ইউনিটগুলোকে ইরানের ৩১টি প্রদেশভিত্তিক কমান্ড ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়, যাতে স্থানীয় কমান্ডাররা পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল

স্থল যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের নৌবাহিনী পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি এলাকায় শত্রুর চলাচল কঠিন করে তুলতে চেষ্টা করবে। এখানে দ্রুতগতির নৌকা, মাইন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাণিজ্য ও সামরিক চলাচল ব্যাহত করা লক্ষ্য।

আরও পড়ুন
অন্যদিকে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী শত্রুর অবকাঠামো ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার আঘাত হানতে পারে।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইরানের কৌশলে অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে লাখ লাখ ডলার খরচ হয় বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু সেটি প্রতিহত করতে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি খরচ করতে হয়।

এই বৈষম্য সময়কে একটি কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করে।

যদি এক পক্ষ কম খরচে অনেক অস্ত্র তৈরি করতে পারে এবং অন্য পক্ষকে তা ঠেকাতে বেশি খরচ করতে হয়, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়াই চাপ তৈরির একটি উপায় হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ যুদ্ধ তত্ত্বের প্রভাব

এই ধারণা পুরোপুরি নতুন নয়। এর সঙ্গে মাও জেডং-এর ‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের তত্ত্ব’র মিল আছে। 

জাপানের বিরুদ্ধে চীনের যুদ্ধে মাও বলেছিলেন, দুর্বল পক্ষকে শক্তিশালী শত্রুকে দ্রুত হারাতে হবে না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ টেনে নিয়ে গিয়ে শত্রুর শক্তি ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ক্ষয় করে দিতে হবে।

এই ধারণা পরে ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া ও আফগানিস্তানের মতো অনেক সংঘাতে দেখা গেছে।

ইরানের ভেতরে এই চিন্তার বিকাশ যেভাবে 

ইরানের এই চিন্তার অন্যতম তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত হাসান আব্বাসি। তিনি শুধু সামরিক কৌশল নয়, বরং রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দীর্ঘ যুদ্ধের ধারণাকে ব্যাখ্যা করেন। আর মোহাম্মদ আলি জাফারি আইআরজিসির কাঠামোর মধ্যে এই ধারণাগুলোকে বাস্তব রূপ দেন।

আরও পড়ুন
‘চতুর্থ উত্তরসূরি’ ধারণা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর আগে নাকি একটি পরিকল্পনা ছিল—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একাধিক সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্ধারণ করা।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চারজন পর্যন্ত বিকল্প উত্তরসূরি রাখা হয়েছিল। এটিই ‘চতুর্থ উত্তরসূরি’ ধারণা নামে পরিচিত।

এর উদ্দেশ্য ছিল—কোনো নেতা নিহত হলেও পুরো ব্যবস্থায় যেন অচলাবস্থা তৈরি না হয়।

এখন কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক কৌশল সাধারণত দ্রুত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, নির্ভুল হামলা এবং নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত হানার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ইরানের এই কৌশল তৈরি করা হয়েছে ঠিক সেই পরিস্থিতির জন্যই—যাতে বড় আঘাতের পরও পুরো ব্যবস্থা ধসে না পড়ে।

অর্থাৎ, বড় ক্ষতি হলেও রাষ্ট্র যেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে—এই ধারণার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নীতি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার