Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: কোন দেশে সবচেয়ে বেশি বাড়ল পেট্রোলের দাম

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: কোন দেশে সবচেয়ে বেশি বাড়ল পেট্রোলের দাম

বিজ্ঞাপন

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বের মোটরচালিত যানবাহনের মালিকদের ওপর। ইতোমধ্যে তারা অনুভব করতে শুরু করেছেন এর কঠিন বাস্তবতা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) খুচরা জ্বালানি মূল্য ট্র্যাকার 'এএএ ফুয়েল প্রাইসেস' এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন রেগুলার পেট্রোলের দাম ফেব্রুয়ারিতে গড়ে ছিল ২ দশমিক ৯৪ ডলার, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫৮ ডলারে—অর্থাৎ দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্য তাদের নিজস্ব পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করলেও, বেশ কিছু রাজ্যে প্রতি গ্যালনের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই দাম ৫ ডলার অতিক্রম করেছে, যা গত দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কোন দেশগুলোতে পেট্রোলের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে

বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশের খুচরা জ্বালানি মূল্যের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশকারী প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল পেট্রোল প্রাইসেসের’ (জিপিপি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রাথমিক হামলার পর অন্তত ৮৫টি দেশে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। কিছু দেশ কেবল মাসের শেষে দাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়, তাই এপ্রিল মাসে আরও অনেক দেশে উচ্চমূল্যের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কম্বোডিয়ায় পেট্রোলের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে—প্রায় ৬৮ শতাংশ। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি যেখানে প্রতি লিটার ৯৫-অক্টেনের দাম ছিল ১ দশমিক ১১ ডলার, ১১ মার্চ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩২ ডলারে। এরপরই রয়েছে ভিয়েতনাম (৫০ শতাংশ বৃদ্ধি), নাইজেরিয়া (৩৫ শতাংশ), লাওস (৩৩ শতাংশ) এবং কানাডা (২৮ শতাংশ)।

সবচেয়ে বেশি মূল্য চুকাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো

তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য এশিয়া মহাদেশ হরমুজ প্রণাণির ওপর অসমভাবে নির্ভরশীল, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। প্রণালিটি পারস্য উপসাগরকে (যাকে আরব উপসাগরও বলা হয়) ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং এই অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত সমুদ্রে পৌঁছানোর এটিই একমাত্র পথ।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম; যারা তাদের প্রয়োজনীয় তেলের যথাক্রমে ৯৫ শতাংশ এবং ৭০ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করে।

পূর্ব এশিয়ার এই উভয় দেশই তাদের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ৮ মার্চ, জাপান তার কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড়ার প্রস্তুতির জন্য তেল সংরক্ষণাগারগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এর পরের দিনই, দক্ষিণ কোরিয়া গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় এই যুদ্ধের প্রভাব পূর্ব এশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ; কারণ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ অনেক কম।

জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সরকার সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি অফিসগুলো এখন থেকে সপ্তাহে চার দিন চলবে, স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং জ্বালানি সাশ্রয় করতে ৫০ শতাংশ 'ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম' (বাসা থেকে কাজ) নীতি কার্যকর করা হয়েছে।

ইউরোপে, জি-সেভেনভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনার জন্য একটি জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। সেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গ্রাহকদের ওপর চাপ কমাতে জরুরি কৌশলগত মজুদের ২০-৩০ শতাংশ বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।

জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য কীভাবে খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়

জ্বালানি তেলের দাম এবং খাদ্যের দাম একে অপরের পরিপূরক হিসেবে চলে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে ক্ষেত থেকে সুপারমার্কেটের তাকে খাবার পৌঁছে দেওয়া ট্রাক পর্যন্ত—খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সব স্তরেই জ্বালানির দাম প্রভাব ফেলে।

তেলমূল্য বৃদ্ধি সরাসরি জাহাজ চলাচল ও পরিবহন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, ‘পরিবহন হলো বিশ্ব অর্থনীতির জীবনরক্ত। এটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়—এটি একটি লজিস্টিক সমস্যা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং পরিশেষে পরিবহনই হলো বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি।’

বর্তমানে 'স্ট্যাগফ্লেশন' —অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা ঐতিহাসিকভাবে বড় ধরনের তেলের সংকটের সময় দেখা দেয়। অর্থনীতিবিদরা ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালের সংকটের উদাহরণ টেনে বলছেন যে, অতীতে তেলের দামের সব উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফনের পরই কোনো না কোনো রূপে বিশ্বমন্দা দেখা দিয়েছে।

নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে মানুষ তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাবারের পেছনে ব্যয় করে এবং প্রচুর পরিমাণে শস্য ও সার আমদানি করে, সেখানে তেলের দাম বৃদ্ধি দ্রুত খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

তেল ও গ্যাস থেকে কোন পণ্যগুলো তৈরি হয়

তেল ও গ্যাস কেবল জ্বালানি হিসেবেই নয়, আরও অনেক কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলো হাজার হাজার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কাঁচামাল।

প্লাস্টিক জাতীয় পণ্য—যেমন পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, ফোনের কেসিং এবং চিকিৎসার সিরিঞ্জ—সবই অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি।

পলিয়েস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকের মতো সিন্থেটিক কাপড়েরও গোপন উপাদান হলো এই অপরিশোধিত তেল, যা খেলাধুলার পোশাক থেকে শুরু করে কার্পেট তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রসাধনী শিল্পেরও মূল ভিত্তি, কারণ পেট্রোলিয়াম জেলি (ভ্যাসলিন), লিপস্টিক এবং কনসিলার তৈরিতে এটি ব্যবহার করা হয়।

গৃহস্থালির বিভিন্ন পণ্যও তেল-ভিত্তিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল; যেমন লন্ড্রি ডিটারজেন্ট, ডিশওয়াশিং লিকুইড এবং পেইন্ট—সবই পেট্রোলিয়াম পণ্য থেকে তৈরি।

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মূলত সারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত হয়। এই সার ফসলের ফলন বাড়াতে এবং খাদ্যের চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।

সূত্র: আলজাজিরা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার