Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ইরানকে কি ধ্বংস করে দিতে বলছে আমিরাত

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

ইরানকে কি ধ্বংস করে দিতে বলছে আমিরাত

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবা বলেছেন, ইরানের ওপর চলমান ইসরাইলি-মার্কিন যুদ্ধে ‘একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়’; পরিবর্তে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে একটি ‘চূড়ান্ত পরিণতির’ আহ্বান জানিয়েছেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে এক নিবন্ধে ইউসেফ আল-ওতাইবা যুদ্ধটি কে শুরু করেছে তা উল্লেখ করেননি এবং এর দায়ভার ইরানের ওপর চাপিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। পাশাপাশি তিনি আমিরাতকে এই সংঘাতের ‘সম্মুখ সারিতে’ চিত্রিত করেছেন।

আরও পড়ুন
আমিরাতি এই কূটনীতিক লিখেছেন, ‘আমাদের এমন একটি চূড়ান্ত পরিণতি প্রয়োজন যা ইরানের সব ধরনের হুমকির মোকাবিলা করবে: পারমাণবিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সন্ত্রাসী প্রক্সি এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ অবরোধ।’ তার এই বক্তব্য মূলত সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার প্রতি সমর্থনেরই ইঙ্গিত দেয়।

ওতাইবা আরও লিখেছেন, ‘ইরান আমিরাতের দিকে ২ হাজার ১৮০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে, যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি।’

চলতি মাসের শুরুর দিকে তেহরান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ ইমামিয়ান বলেছিলেন, ‘ইরান যে আমিরাতে হামলা চালাচ্ছে তার অন্যতম কারণ শুধু মার্কিন ঘাঁটিগুলোই নয়; বরং সেখানে ইসরাইলি ঘাঁটির উপস্থিতিও এর একটি বড় কারণ।’

দীর্ঘদিন গোপনে বজায় রাখার পর, ২০২০ সালে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর অংশ হিসেবে আমিরাত এবং ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

সেই থেকে আবুধাবি ইসরাইলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। 

বিশেষ করে সৌদি আরবে, যেখানে রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত একজন শিক্ষাবিদ সম্প্রতি ইউএই-কে ‘জায়নবাদের কোলে’ ঝাঁপিয়ে পড়ার এবং আরব বিশ্বে ‘ইসরাইলের ট্রোজান হর্স’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

ওতাইবা বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তাদের প্রক্সিরা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের হুমকি দূর করতে আরও অনেক কিছু করা দরকার।’ তার এই বক্তব্য মূলত সংঘাত আরও বাড়ানোর একটি আহ্বান বলে মনে হচ্ছে।

সুদান, লিবিয়া ও ইয়েমেনে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া এবং সোমালিয়ার বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোকে সহায়তাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে ভূমিকার কারণে বিশ্লেষক ও অধিকার গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে আমিরাত।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে আমিরাতের অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসতে পারে—এমন সতর্কতা সত্ত্বেও ওতাইবা যুক্তরাষ্ট্রে আবুধাবির ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। 

তিনি যোগ করেন, ‘আমেরিকার সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত দৃঢ় হবে, উভয় দেশ তত শক্তিশালী হবে।’

ইরানিদের উত্তেজিত করা

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই নিবন্ধ আমিরাতি কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান কঠোর বক্তব্যের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রথাগত অবস্থানের সঙ্গে তাদের বাড়তে থাকা দূরত্বকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ আরব লীগ এবং ওআইসির নীরবতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। 

তিনি জানতে চান কেন কোনো সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না ‘যখন আমাদের দেশ ও জনগণ এই বিশ্বাসঘাতক ইরানি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে?’

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘এই অনুপস্থিতি ও অক্ষমতার পর পরবর্তীতে আরব ও ইসলামি ভূমিকার পতন নিয়ে কথা বলা বা আমেরিকান ও পশ্চিমা উপস্থিতির সমালোচনা করা অগ্রহণযোগ্য।’

‘আমিরাত এখন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে চায় যে পরিস্থিতি তাদের ‘নিয়ন্ত্রণে’ আছে।’

— আন্দ্রেয়াস ক্রিগ, কিংস কলেজ লন্ডন।

দুবাইয়ের সাবেক পুলিশ প্রধান ধাহি খালফান তামিম আরও এক ধাপ এগিয়ে আরব দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন এবং পশ্চিমা শক্তি ও ইসরাইলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে পশ্চিমা দেশগুলোই বন্ধুপ্রতীম দেশ, আর যাদের আমরা ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ বলি, তারা আসলে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন।’

বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতের এই বার্তার পেছনে রয়েছে এক গভীর কৌশলগত ঝুঁকি। দেশটি তার অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলেছে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং বিশ্ব পুঁজির জন্য উন্মুক্ত থাকার ভাবমূর্তির ওপর। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলা সেই ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘আমিরাত এখন বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে চায় যে পরিস্থিতি তাদের ‘নিয়ন্ত্রণে’ আছে; অথচ বাস্তবে তারা ইরানের বেপরোয়া সামরিক অভিযানের বিপরীতে কেবল মৌখিক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।’

ক্রিগ আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক সুর সত্ত্বেও ওতাইবার কথার সারমর্ম খুব সামান্যই। কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অভিযানে অর্থবহ অবদান রাখার মতো কৌশলগত গভীরতা ও সক্ষমতা আমিরাতের একার নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে যেকোনো ব্যবস্থায় তিনি উপসাগরীয় অংশীদারদের সরিয়ে দিতে পারেন। এই সপ্তাহের শুরুতে তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, তিনি এবং ইরানের নেতৃত্ব ‘যৌথভাবে’ হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

ক্রিগ সতর্ক করেছেন যে, নিজেকে ‘নির্ভরযোগ্য সামরিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরা—যা যেকোনো পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করবে’—আমিরাতের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘তারা ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান পার্টির নব্য-রক্ষণশীলদের কাছে কিছু বাহবা পেতে পারে, কিন্তু এর ফলে ইরানিরা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হবে।’

এর ফলে আবুধাবি তার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও শক্তভাবে বেঁধে ফেলছে, যা তাকে উপসাগরীয় ঐকমত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই বাজি বা ঝুঁকি দেশটিকে নিজস্ব অঞ্চলেই ক্রমে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার