বিজ্ঞাপন
ইসলামাবাদ সংলাপ
বিলাসবহুল হোটেলে সে রাতে দরজার আড়ালে যা ঘটে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানের ইসলামবাদে বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ এক রাত ছিল গত শনিবার। স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ ও চুক্তি করার আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বড় ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর দুই দেশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাই বলেছেন, তারা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সেটি আসলে ভেস্তে গিয়েছিল কীভাবে- তা নিয়ে এখনো জনমনে প্রশ্ন আছে। বিষয়টি নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স পাকিস্তান ছাড়াও দুই দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেছে। হোটেল পরিচালনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারাও কিছু তথ্য দিয়েছেন। যা থেকে বৈঠকের মুহূর্তগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
হোটেলটির কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি আলাদা উইং এবং একটি কমন এরিয়াতে রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। একটি উইংয়ে ছিল মার্কিন প্রতিনিধি দল, অন্যটিতে ইরানিরা। মাঝখানের কমন এরিয়ায় পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনার মূল কক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। ফলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফসহ অন্য প্রতিনিধিরা বিরতির সময় কক্ষের বাইরে গিয়ে নিজ দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পাকিস্তান সরকারের একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকের মাঝামাঝি সময়ে বড় ধরনের সাফল্যের আশা তৈরি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল দুই পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে যাচ্ছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত অন্য একটি সূত্র দাবি করেছে, উভয় পক্ষ একটি চুক্তির ‘খুবই কাছাকাছি’ পৌঁছেছিল। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমন কিছু বিষয় সামনে আসে যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব হয়নি।
আলোচনার টেবিলে সেদিন মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, সেদিন বৈঠকের পরিবেশ ছিল গুরুগম্ভীর এবং ‘অবন্ধুসুলভ’। পাকিস্তান পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করলেও কোনো পক্ষই উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে খুব একটা নমনীয়তা দেখায়নি।
একসময় পরিবেশ বদলে গেল
ইরানের সূত্র দুটি জানিয়েছে, রোববার ভোরের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। আশা করা হচ্ছিল সংলাপ আরও একদিন চলবে। কিন্তু মার্কিন একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর চুক্তির দিকে এগোনো। কিন্তু ইরানিরা সম্ভবত এটি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। ফলে পরিবেশ বদলে যায়।
ইরানি সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে মূল বিষয়গুলোর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের স্পিকার বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এ সময় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই আলোচনায় বেশ উত্থান-পতন ছিল। এমনকি উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তও তৈরি হয়েছিল। সে সময় কেউ কেউ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরে আবার ফিরে আসেন।
পাঁচটি পাকিস্তানি সূত্র জানায়, সেনাপ্রধান অসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারসহ পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা সারারাত দুই পক্ষের কাছে গিয়েছেন। আলোচনাকে সঠিক পথে রাখার চেষ্টা করেছেন।
কয়েকটি সূত্র জানায়, আলোচনায় কখনো কখনো অন্তত একটি কাঠামোগত সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি এবং জব্দ সম্পদের পরিমাণ নিয়ে মতবিরোধের কারণে তা ভেঙে যায়।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এক কূটনীতিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ থেকে চলে যাওয়ার পরও মধ্যস্থতাকারী ও আমেরিকানদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে।
‘আপনাদের বিশ্বাস করব কীভাবে?’
শনিবার বিকেলে শুরু হওয়া ওই আলোচনা প্রায় ২০ ঘণ্টা ধরে চলে। দুটি ইরানি সূত্র জানায়, এতে যখন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার (ভবিষ্যতে ইরানে হামলা না করার অঙ্গীকার) প্রসঙ্গ ওঠে তখন কক্ষের ভেতর থেকে আব্বাস আরাগচির কণ্ঠ ভেসে আসছিল। সাধারণত শান্ত স্বভাবের আরাগচি তখন বেশ কঠোর স্বরে কথা বলছিলেন।
আরাগচির উত্তেজিত কণ্ঠের বাক্যটি ছিল অনেকটা এরকম- ‘কূটনৈতিক আলোচনা চলার সময় হামলা না করার কথা বলে পরে যদি তা ভঙ্গ করেন, তাহলে আমরা আপনাদের বিশ্বাস করব কীভাবে?’
আরাগচির এই কথাটি মূলত যুদ্ধ শুরুর আগের আলোচনাকে ইঙ্গিত করে। গত ফেব্রুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেছিলেন। এটি শেষ হওয়ার দুই দিনের মাথায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে।
শনিবারের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বিষয়ে মতপার্থক্যের পাশাপাশি সম্ভাব্য চুক্তির পরিধি নিয়েও দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ ছিল। দুটি সূত্র জানায়, ওয়াশিংটন মূলত পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজকে গুরুত্ব দিচ্ছিল। বিপরীতে তেহরান চাইছিল সমঝোতার পরিধি আরও বিস্তৃত করা হোক।
এক পর্যায়ে উত্তেজনা এতটাই বেড়ে যায় যে, কক্ষের বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও উচ্চস্বরের কথা শোনা যাচ্ছিল। পরিস্থিতি শান্ত করতে তখন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনির ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চা-বিরতির ডাক দেন। সূত্র জানিয়েছে, বিরতির সময় দুই পক্ষকে পৃথক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।
‘এটাই আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব’
পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আলোচনার শেষ পর্যায়ে মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানিদের তুলনায় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে অনেক বেশি যাতায়াত করছিলেন। এ নিয়ে মার্কিন সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করার লক্ষ্য নিয়ে এলেও তারা সতর্ক ছিল। তারা দেখছিল, ইরান ছাড় দিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাই প্রতিনিধিদের মধ্যে এক সময় ধারণা জন্মে, আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে।
একটি শেষ বিন্দুতে না পৌঁছালেও রোববার সকালে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের সামনে গিয়ে ঘোষণা দেন, আলোচনা শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে একটি খুবই সরল প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি। এটিই আমাদের চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব। এখন দেখা যাক ইরান সেটি গ্রহণ করে কি না।’
ভ্যান্সের ওই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। সূত্রগুলো বলছে, নতুন করে আবার সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে।