Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

১০ বছরের চেষ্টায় এক পরিবারের উত্তর কোরিয়া পালানোর রুদ্ধশ্বাস গল্প

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম

১০ বছরের চেষ্টায় এক পরিবারের উত্তর কোরিয়া পালানোর রুদ্ধশ্বাস গল্প

বিজ্ঞাপন

৬ মে, ২০২৩। অন্ধকার রাতে উত্তাল পীত সাগরের বুক চিরে ধেয়ে আসছে একরাশ ঝোড়ো হাওয়া। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপই যেন শাপে বর হয়ে এল কিম ইল-হিয়ক ও কিম ই-হিয়ক নামের দুই ভাইয়ের কাছে। 

উত্তর কোরিয়ার কড়া পাহারায় থাকা সীমান্ত গলিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এমন এক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ারই অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

দীর্ঘ ১০ বছরের পরিকল্পনা আর বাবার শেষ ইচ্ছা বুকে চেপে তারা পা বাড়িয়েছিলেন এক অনিশ্চিত কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার পথে।

পরিকল্পনা যেখান থেকে

এই দুঃসাহসিক অভিযানের নেপথ্যে ছিলেন পরিবারের প্রয়াত প্রধান। ১০ বছর আগে তিনিই প্রথম সন্তানদের কানে মন্ত্র দিয়েছিলেন— ‘এই সমাজে কোনো আশা নেই... বাইরে এক বিশাল মুক্ত পৃথিবী আছে। চলো আমরা দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যাই।’

কিম ইল-হিয়ক বলেন, ‘আমাদের পরিবারে আগে কখনো নৌকা বা মাছ ধরার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না।’ 

বাবার সেই নির্দেশ পালনে ছোট ভাই ই-হিয়ককে পাঠানো হয়েছিল সমুদ্র উপকূলে মাছ ধরার কাজ শিখতে। দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজ শিখে তিনি নিজের একটি নৌকা তৈরি করেন। স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে এবং বিশ্বস্ততা অর্জন করে গড়ে তোলেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

বছরের পর বছর তারা সীমান্তের কাছে মাছ ধরতে যেতেন এবং আবার ফিরে আসতেন, যাতে পাহারাদারদের মনে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে।

গোপন টিভিতে দেখা অন্য পৃথিবী

উত্তর কোরিয়ায় তারা তুলনামূলক স্বচ্ছল ছিল। কিমের বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। তাদের ঘরে ছিল সরকারি নিবন্ধিত একটি বড় টিভি। পাশাপাশি চীন থেকে চোরাই পথে গোপনে আনা আরেকটি ছোট টিভি।

সেই টিভিতে তারা দক্ষিণ কোরিয়ার ১০টি চ্যানেল দেখতে পেতেন।

ইল-হিয়ক বলেন, ‘আমরা তামার তার দিয়ে অ্যান্টেনা বানিয়েছিলাম। ঘরের ভেতর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিগনাল খুঁজতাম। সেই টিভিতে রাতে আলো জ্বলা শহর, পর্যাপ্ত খাবার, স্বাধীন চলাচল, গরম পানি দেখা যেত। একেবারে অন্য এক জগৎ।’

মহামারি ও বেঁচে থাকার লড়াই

২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইল হিয়ক গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ব্যবসা করতেন। তারপর এল কোভিড মহামারি। 

তিনি বলেন, ‘আমি তখন সবজি, ফল বিক্রি শুরু করি। অনেক মানুষ তখন না খেয়ে মারা যাচ্ছিল।’ 

‘আমি একদিন ৪ হাজার ওয়নে চাল কিনে পরদিনই ৮ হাজার বা ১০ হাজার ওয়নে বিক্রি করতে পেরেছিলাম। আমার ব্যবসা ভালো চলছিল। কিন্তু যাদের কিছুই ছিল না, তারা আরও বেশি অনাহারে পড়ছিল।’

তবে স্বাধীনতা পেতে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা কখনোই মাথা থেকে দূরে সরাননি তারা। পীত সাগর হঠাৎ একদিন উত্তাল হয়ে উঠলে কিম ভাতৃদ্বয় খুঁজে পান সুযোগ। 

পালানোর সেই রাতে নৌকায় ছিলেন পরিবারের ৯ জন সদস্য। সঙ্গে ছিল বাবার চিতার ভস্ম। গর্ভবতী স্ত্রীকে রাজি করানোই ছিল ইল-হ্যেয়কের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘আমি তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য আমাদের দক্ষিণ কোরিয়ায় যেতেই হবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি কি চাও আমাদের সন্তানরা এইরকম একটা দেশে বড় হোক?’ 


নৌকায় ওঠার আগে নারীদের পাড়ি দিতে হয়েছে এক ভয়াবহ মাইনফিল্ড। উত্তর কোরিয়ার আইন অনুযায়ী নারীদের নৌকায় ওঠা নিষিদ্ধ, তাই ধরা পড়লেই ধরে নেওয়া হয় যে তিনি দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন। আর সেই বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে যখন তারা উপকূলে পৌঁছান, তখন দুই শিশুকে (৪ ও ৬ বছর বয়সী) লুকিয়ে রাখা হয়েছিল পাটের বস্তার ভেতর। 

কিম ইল-হিয়ক বলেন, ‘ঢেউগুলো সহজেই আমাদের নৌকাটিকে পাথরের সাথে আছড়ে ফেলতে পারত, যার ফলে এটি সাথে সাথেই ডুবে যেত, কিন্তু আমরা সবকিছু সাবধানে পরিকল্পনা করেছিলাম। আমরা ধীরে ধীরে পাথরগুলোর কাছে গেলাম, সেখানে আমরা নারী ও শিশুদের নৌকায় তুলে আনতে সক্ষম হলাম।’

সিএনএনকে ইল-হিয়ক সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার নিজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি ইঞ্জিনের শব্দের চেয়েও জোরে শোনা যাচ্ছিল। আমরা এতটাই শান্তভাবে নৌকা চালাচ্ছিলাম যাতে রাডারে আমাদের কেবল ভাসমান আবর্জনা মনে হয়।’

প্রায় দুই ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যাত্রার পর তারা যখন দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়নপিয়ং দ্বীপের আলো দেখতে পান, তখন সবার মনে দানা বাঁধে প্রশান্তি। দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে তারা বলেন, ‘না, আমাদের ইঞ্জিন নষ্ট হয়নি। আমরা উত্তর কোরিয়ার জেলে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নিতে এসেছি।’

মুক্ত পৃথিবীতে আসার চার মাস পর ইল-হিয়কের কোল আলো করে আসে কন্যাসন্তান ইয়েরি। গত বছর সিউলের এক জমকালো হলে ইয়েরির প্রথম জন্মদিন পালন করে পুরো পরিবার। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে আসে শোকের ছায়া। 

মুক্তির মাত্র ১৯ মাসের মাথায় এক স্কুবা ডাইভিং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ছোট ভাই ই-হিয়ক। তিনি ছিলেন এই পুরো অভিযানের অন্যতম প্রধান কারিগর। 

ভাইকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ ইল-হিয়কের জীবন সংগ্রাম থেমে নেই। বর্তমানে তিনি শেফ হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, ফর্কলিফট চালানো শিখছেন এবং উত্তর কোরিয়ার বন্দিদশার গল্প শুনিয়ে বেড়াচ্ছেন বিশ্বকে। গত মার্চে তার দ্বিতীয় কন্যা ইয়ে-উনের জন্ম হয়েছে। 

নিজের যন্ত্রণাবিদ্ধ কিন্তু সফল এই যাত্রা নিয়ে ইল-হিয়কের সোজাসাপ্টা মন্তব্য— ‘আমি নিজেকে একজন ভাগ্যবান মানুষ হিসেবে মনে করি।’ 

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার