Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

সেদিন রসগোল্লা খাইয়েও শুভেন্দুকে তৃণমূলে রাখতে পারেননি অভিষেক

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:২৯ এএম

সেদিন রসগোল্লা খাইয়েও শুভেন্দুকে তৃণমূলে রাখতে পারেননি অভিষেক

বিজ্ঞাপন

সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা করেছে বিজেপি। গতকাল শুক্রবার বিজেপির জয়ী বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তার নাম চূড়ান্ত করেন। 

এবারের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। রসগোল্লা খাইয়েও শুভেন্দুকে তৃণমূলে রাখতে পারেননি অভিষেক।

দলের ভরাডুবির পর অনেক নেতাই এখন প্রশ্ন তুলছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত উত্থান নিয়ে।

দলের একাংশের মতে, ২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবার থেকে অভিষেককে লোকসভা প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত থেকেই দলের ভিতরে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হতে শুরু করে। সে সময় আপত্তি জানিয়েছিলেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায়।

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর দুই মাসের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের ভিতরে পরিবর্তন শুরু হয়।

ওই বছর ব্রিগেডে শহিদ দিবসের সভায় প্রথম বড়ভাবে সামনে আসেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন তিনি মমতার ভাইপো হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

সেই সভাতেই ‘যুবা’ নামে নতুন একটি সংগঠন গঠন করা হয় এবং তার দায়িত্ব দেওয়া হয় অভিষেককে। কিন্তু আগে থেকেই দলের যুব সংগঠন ছিল ‘যুব তৃণমূল’, যার সভাপতি ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।

পরে শুভেন্দুকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়।

এই পরিবর্তন ঘিরে দলে প্রশ্ন ওঠে, আগে থেকেই যুব সংগঠন থাকলে নতুন সংগঠন কেন তৈরি করা হলো। অনেকের মতে, ধীরে ধীরে শুভেন্দুর জায়গায় অভিষেককে সামনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরে যুব তৃণমূলের নেতৃত্ব অভিষেকের হাতে গেলে সেই ধারণাই আরো শক্ত হয়। এরপর থেকেই শুভেন্দু ও অভিষেকের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে শুরু করে বলে তৃণমূলের অন্দরে আলোচনা হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত ১৫ বছরে শুভেন্দু ধীরে ধীরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ভরসার নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু অভিষেকের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুভেন্দু দলের ভিতরে কোণঠাসা হতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। 

তারপর ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে আলোচনায় আসেন শুভেন্দু। গত পাঁচ বছর তিনি মমতাকে আক্রমণ করে রাজ্যে বিরোধী রাজনীতির মুখ হয়ে ওঠেন। এবার ভবানীপুরেও মমতাকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে পৌঁছে গেলেন।

শুভেন্দুর রাজনৈতিক উত্থানের শুরু হয়েছিল নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন থেকে। সেই আন্দোলনে মমতা ছিলেন প্রধান, আর মাঠের সংগঠনের দায়িত্ব সামলাতেন শুভেন্দু। একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হলেও সময়ের সঙ্গে তিনিই হয়ে ওঠেন তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

২০১১ সালের পর থেকেই তৃণমূলের ভিতরে অভিষেক ও শুভেন্দুর দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। যুব সংগঠনের নেতৃত্ব, দলীয় প্রভাব বিস্তার, প্রার্থী বাছাই এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর সেই সংঘাত আরো তীব্র হয়।

পরবর্তীতে আই-প্যাককে নিয়ে তৃণমূলের সংগঠনে বড় পরিবর্তন আনা হয়। জেলাভিত্তিক পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়, যেখানে শুভেন্দুর শক্ত প্রভাব ছিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে শুভেন্দুর সঙ্গে দলের সম্পর্ক আরো খারাপ হয়ে যায়।

তবে ২০২০ সালের বিধানসভা ভোটের আগে শুভেন্দু অধিকারীকে দলে রাখার চেষ্টা চলছিল। কারণ তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সময় ১ ডিসেম্বর শ্যামবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। সেখানে শুভেন্দু, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্ত কিশোর এবং দুই বর্ষীয়ান নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌগত রায় উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের সময় অভিষেকের ফোন থেকে শুভেন্দু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও কথা বলেন। তবুও মতবিরোধ মেটেনি। পরে অভিষেক শুভেন্দুকে মিষ্টি খাইয়ে দলে রাখার চেষ্টা করলেও সিদ্ধান্তে বদল হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে অমিত শাহর হাত ধরে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২০ সালের করোনা পরিস্থিতির সময় থেকেই শুভেন্দু আলাদা রাজনৈতিক পথের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেন। জঙ্গলমহলে নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম চালান এবং ধীরে ধীরে মন্ত্রিত্ব, চেয়ারম্যান পদ ও বিধায়ক পদ ছাড়েন। এরপর বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি সরাসরি মমতার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিগেডের মঞ্চে যে দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছিল, ভবানীপুরের নির্বাচনে এসে তার পূর্ণতা মিলল। একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ সেনা শুভেন্দুই এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার