বিজ্ঞাপন
জাকাতের টাকা দিয়ে কি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ করা যাবে?
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
বিজ্ঞাপন
জাকাত ইসলামের একটি ফরজ ইবাদত, যার নির্দিষ্ট খাত ও নিয়ম কুরআন ও হাদিস দ্বারা নির্ধারিত। অনেক মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—জাকাতের টাকা দিয়ে কি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ করা যাবে?
কারণ মসজিদ ও মাদ্রাসা দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং এগুলোর মাধ্যমে মানুষের ইবাদত ও শিক্ষা বিস্তার লাভ করে।
তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং কুরআনের নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে জাকাতের খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
“জাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য।” (সূরা তাওবা: ৬০)।
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জাকাত ব্যক্তিকে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের হাতে। অর্থাৎ জাকাতের মালিকানা সরাসরি কোনো দরিদ্র বা প্রয়োজনী ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো শর্ত।
মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ একটি সওয়াবের কাজ হলেও তা কোনো নির্দিষ্ট ফকির বা মিসকিন ব্যক্তির মালিকানায় যায় না। বরং তা একটি স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় হয়।
তাই অধিকাংশ আলেমের মতে, জাকাতের টাকা দিয়ে সরাসরি মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা ভবন তৈরি, রাস্তা বা কূপ খনন করা জায়েজ নয়। কারণ এতে জাকাতের শর্ত পূরণ হয় না—
জাকাত অবশ্যই এমন ব্যক্তিকে দিতে হবে, যে জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মসজিদ নির্মাণ ও বিভিন্ন সামাজিক কাজ হতো সাধারণ সদকা বা দান দিয়ে, জাকাত দিয়ে নয়। সাহাবায়ে কেরাম জাকাত আলাদা খাতে ব্যয় করতেন এবং মসজিদ নির্মাণে নিজেদের স্বেচ্ছা দান ব্যবহার করতেন।
এতে বোঝা যায়, জাকাত ও সাধারণ সদকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জাকাত একটি নির্ধারিত ফরজ ইবাদত, আর মসজিদ নির্মাণ সাধারণ সদকা বা ওয়াকফের অন্তর্ভুক্ত।
তবে কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হয় “ফি সাবিলিল্লাহ” শব্দটি নিয়ে। অনেকেই মনে করেন, যেকোনো দ্বীনি কাজই “ফি সাবিলিল্লাহ”-এর মধ্যে পড়ে, তাই মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণে জাকাত দেওয়া যাবে।
কিন্তু অধিকাংশ ফকিহের মতে, এখানে “ফি সাবিলিল্লাহ” বলতে মূলত এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে আল্লাহর পথে বের হয়েছে কিন্তু অর্থের অভাবে অসহায় হয়ে পড়েছে, যেমন-
মুজাহিদ বা দ্বীনি কাজে নিয়োজিত দরিদ্র ব্যক্তি। এটি কোনো ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো তৈরির অর্থ নয়।
তবে একটি সূক্ষ্ম ব্যতিক্রম রয়েছে। যদি কোনো মাদ্রাসার ছাত্র বা শিক্ষক অত্যন্ত দরিদ্র হয় এবং জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হয়, তাহলে তাকে ব্যক্তি হিসেবে জাকাত দেওয়া যাবে। সে চাইলে সেই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনা বা জীবনযাপন চালাতে পারে,
কিংবা মাদ্রাসার প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারে। কিন্তু সরাসরি “এই টাকা মাদ্রাসা বিল্ডিং বানানোর জন্য” বলে জাকাত দেওয়া জায়েজ হবে না। এখানে মূল বিষয় হলো, জাকাত ব্যক্তি মালিকানায় পৌঁছানো।
মসজিদ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম হলো সাধারণ দান, সদকা, ওয়াকফ বা নফল ইনফাক। হাদিসে এসেছে,
“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।”
এই সওয়াব অর্জনের জন্য জাকাতের টাকা নয়, বরং নিজের হালাল উপার্জনের নফল দান ব্যবহার করাই উত্তম ও নিরাপদ পথ।
অনেকে মনে করেন, মসজিদ বা মাদ্রাসার কাজ যেহেতু বড় সওয়াবের, তাই জাকাত দিলে দ্বিগুণ সওয়াব হবে। কিন্তু শরিয়তের নিয়ম লঙ্ঘন করে ইবাদত করলে তা কবুল হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না।
জাকাত একটি আমানত, যা নির্দিষ্ট খাতে পৌঁছানো ফরজ। ভুল খাতে দিলে ফরজ আদায় হবে না, বরং দায় থেকে যাবে।
জাকাতের টাকা দিয়ে সরাসরি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ করা জায়েজ নয়। জাকাত অবশ্যই ফকির, মিসকিন ও শরিয়ত নির্ধারিত ব্যক্তিদের হাতে দিতে হবে।
মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য দান করতে চাইলে নফল সদকা বা সাধারণ অনুদান দেওয়া উচিত।
এতে একদিকে শরিয়তের বিধান মানা হবে, অন্যদিকে দ্বীনি কাজেও অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া যাবে। সঠিক নিয়মে জাকাত আদায় করাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
বিজ্ঞাপন