বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
রোজা অবস্থায় মুখে বা শরীরে লোশন, ক্রিম, ভ্যাসলিন বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে রোজা ভাঙে কি না—এ প্রশ্ন অনেকের মনে আসে।
ইসলামী শরিয়তের মূল নীতিমালা ও হাদিসের আলোকে এর সঠিক উত্তর জানা জরুরি।
রোজা ভাঙার মূল নীতি
রোজা ভাঙার মূল কারণ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বস্তু শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক পথে (মুখ, নাক, গলা) প্রবেশ করানো। খাওয়া, পান করা বা ওষুধ গিলে ফেলা রোজা ভঙ্গের কারণ।
কিন্তু শরীরের বাইরে কোনো কিছু লাগানো, যেমন তেল, লোশন, ক্রিম, সুগন্ধি—এসব রোজা ভাঙার অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ এগুলো পেট বা গলার ভেতরে প্রবেশ করে না।
এ বিষয়ে ইসলামী ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো: “যা কিছু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে না, তা দ্বারা রোজা ভাঙে না।”
হাদিসের প্রমাণ
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) রোজা অবস্থায় মাথায় তেল ব্যবহার করতেন।” (সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রোজা অবস্থায় শরীরে তেল বা অনুরূপ বস্তু লাগানো জায়েজ। লোশন বা ক্রিম তেলেরই আধুনিক রূপ।
তাই তেল যদি রোজা অবস্থায় ব্যবহার করা যায়, তবে লোশন বা ক্রিম ব্যবহার করাও জায়েজ হবে।
আরেক হাদিসে এসেছে, “নবী (সা.) সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।” (সুনানে তিরমিজি)
সুগন্ধি ব্যবহারের অনুমতি থাকলে ত্বকে লাগানো প্রসাধনীও অনুমোদিত বলে ফকিহরা ব্যাখ্যা করেছেন।
ত্বক দিয়ে কিছু শোষিত হলে কি রোজা ভাঙে ?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, লোশন বা ক্রিম ত্বক দিয়ে শোষিত হলে কি তা রোজা ভাঙে? এর উত্তর হলো: না, এতে রোজা ভাঙে না।
কারণ শরীরের চামড়া দিয়ে শোষিত হওয়াকে শরিয়ত রোজা ভাঙার কারণ হিসেবে গণ্য করেনি। রোজা ভাঙে তখনই, যখন কিছু বস্তু গলা বা পাকস্থলীতে পৌঁছে যায়।
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, “যদি তেল বা কোনো বস্তু চামড়ায় লাগানো হয় এবং তা ভেতরে শোষিত হয়, তবে তাতে রোজা ভাঙে না।” (আল-মাজমু’)
শর্ত ও সতর্কতা
যদিও লোশন বা ক্রিম ব্যবহার করা জায়েজ, তবে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, লোশন বা ক্রিম যেন মুখে বা গলায় প্রবেশ না করে।
বিশেষ করে লিপবাম বা ঠোঁটের ক্রিম ব্যবহার করলে সাবধান থাকতে হবে। যদি তা গিলে ফেলা হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত সাজগোজে সময় নষ্ট করা রোজার আদবের পরিপন্থী। রমজান মাস মূলত আত্মসংযম ও ইবাদতের মাস।
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, আল্লাহ তার শুধু পানাহার ত্যাগের কোনো প্রয়োজন রাখেন না।” (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস বোঝায়, রোজার উদ্দেশ্য শুধু না খাওয়া নয়, বরং সার্বিকভাবে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
নারী ও পুরুষের জন্য বিধান
পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই শরীরে লোশন বা ক্রিম ব্যবহার জায়েজ। তবে শালীনতা ও পর্দার বিধান মানতে হবে।
এমন কোনো প্রসাধনী ব্যবহার করা যাবে না, যা অশালীনতা বা হারাম সাজসজ্জার মধ্যে পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।” (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আত্মিক পরিশুদ্ধতাই রোজার মূল লক্ষ্য।
সংক্ষিপ্ত ফিকহি সিদ্ধান্ত
মুখে বা শরীরে লোশন/ক্রিম মাখলে রোজা ভাঙে না। কারণ এতে কিছু গলা বা পাকস্থলীতে প্রবেশ করে না।
তবে শর্ত হলো— ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু মুখে গিলে না ফেলা অতিরিক্ত সাজগোজে সময় নষ্ট না করা হারাম প্রসাধনী ব্যবহার না করা
রোজা অবস্থায় মুখে বা শরীরে লোশন ও ক্রিম ব্যবহার শরিয়তসম্মতভাবে জায়েজ এবং এতে রোজা নষ্ট হয় না। তবে রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন ও আত্মশুদ্ধি।
তাই বাহ্যিক পরিচর্যার পাশাপাশি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা এমনভাবে পালন করা উচিত, যাতে দেহের পাশাপাশি অন্তরও পবিত্র থাকে।
বিজ্ঞাপন