বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
কিয়ামুল লাইল একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত, যা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। আর নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে মৌলিক বিধান হলো এগুলো একাকী আদায় করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িনদের যুগে নিয়মিতভাবে নফল নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার কোনো প্রচলন ছিল না। যদিও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা জীবনে অল্প কয়েকবার নফল নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করেছেন।
তবে সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। তিনি কখনো পূর্বঘোষণা বা বিশেষ আয়োজন করে লোকসমাগম ঘটিয়ে নফল নামাজ জামাতে আদায় করেননি। বরং তিনি নিজ ঘরে বা কোনো সাহাবির ঘরে নফল নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন, তখন সেখানে উপস্থিত দুই-একজন সাহাবি নিজে থেকেই নবীজি (সা.)কে অনুসরণ করতেন। এসব বর্ণনা থেকে নফল নামাজের জামাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা ও তাকে বেশি সাওয়াবের কাজ মনে করার অবকাশ কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না।
তাই এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরাম বা ইসলামি আইনবিদদের মৌলিক কিছু নীতিমালা নির্ধারিত হয়েছে।
১. যদি কখনো পূর্বঘোষণা বা পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া কেউ নফল নামাজ আদায়ের সময়ে দু-একজন মুক্তাদি নিজ থেকে তাকে অনুসরণ করে নেয় তাহলে এর অবকাশ আছে। ২. নিয়মিত নফল নামাজ জামাতে আদায় করা মাকরুহ। ৩. ডাকাডাকি ছাড়াও যদি মুক্তাদির সংখ্যা তিনজন হয়ে যায়, তাতে ফকিহতের মতভেদ রয়েছে; অনেক ফকিহ এটাকেও মাকরুহ বলে উল্লেখ করেছেন।
৪. মুক্তাদির সংখ্যা চার বা তার চেয়ে বেশি হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে মাকরুহ। ৫. পূর্বঘোষণা বা পূর্বপরিকল্পনা করে নফলের জামাত করা সর্বাবস্থায় মাকরুহ। নফল নামাজের জামাত করা কোনো মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় আমল নয়, বরং শর্ত সাপেক্ষে তা কেবল জায়েজ হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করা বা এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা জায়েজ নয়।
যদি কেউ রমজান মাসে জামাতের নামাজে কোরআন শরিফ খতম করতে চায় তাহলে তারাবির জামাতে খতম করার সুযোগ রয়েছে।
তারাবির জামাত যেকোনো স্থানে করা যেতে পারে। মসজিদেই হতে হবে, গোটা মহল্লাবাসী মিলে একটি জামাতেই শরিক হবে এমন কোনো শর্ত নেই। সুতরাং খতমে কোরআনের প্রয়োজন তারাবির দ্বারাই পূর্ণ করা সম্ভব। এর জন্য তাহাজ্জুদের জামাত করার প্রয়োজন নেই।
ই’লাউস সুনান ৭/৯৭-৯৯, আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯, ফাতাওয়ায়ে রাহিমিয়া ৪/১৩৬)। নফল আদায়কারী ইমামের পেছনে তারাবি আদায় কিয়ামুল লাইলের জামাত মূলত নফল নামাজের জামাত। তারাবি নামাজও নফল হলেও এটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের ইবাদত, যার জন্য আলাদা নিয়ত করা জরুরি। তাই তারাবি আদায় করার ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ নফল নামাজের নিয়ত যথেষ্ট নয়; বরং তারাবির নিয়ত স্পষ্টভাবে করা আবশ্যক।
এই কারণে যদি কেউ মক্কা মুকাররমায় বা মদিনা মুনাওয়ারায় ১০ রাকাত তারাবি আদায় করার পর বাকি ১০ রাকাত পূরণের জন্য কিয়ামুল লাইলের জামাতে অংশগ্রহণ করে এবং সেখানে তারাবির নিয়ত করে, তাহলে তা তারাবি হিসেবে আদায় হবে না, বরং তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। কারণ ইমাম নিজে তারাবির নিয়ত করে নামাজ পড়াচ্ছেন না, বরং নফল নামাজ পড়াচ্ছেন। আর ইমামের নিয়ত ভিন্ন হলে মুকতাদির তারাবি আদায় সহিহ হয় না।
অতএব এমতাবস্থায় উক্ত নামাজ নফল হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু তারাবি হিসেবে আদায় হবে না। এ জন্য তারাবি পূর্ণ করতে হলে পৃথকভাবে তারাবি নামাজ আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/১১৭, ফাতাওয়ায়ে শামি ১/৫৯০, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম জাকারিয়া ২/৪৯৯)। প্রবাসে রোজা শুরু করে দেশে আসায় রোজার সংখ্যা কমবেশি হওয়া যদি কোনো ব্যক্তির সৌদি আরব থাকাবস্থায় (উদাহরণ) রোজা শুরু হয়ে কয়েক দিন থাকার পর বাংলাদেশে চলে আসার কারণে একটি রোজা বেশি হয়ে যায় এবং বাংলাদেশে ২৯ রোজার দিন ঈদুল ফিতরের চাঁদ না দেখা যায় বরং ৩০ রোজা পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে তাকে বাংলাদেশের ৩০তম এবং তার ৩১তম রোজা রাখতে হবে। এ রোজাটি রাখা তার ওপর ওয়াজিব। এটা বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কেননা তার এই রোজা ওই ব্যক্তির রোজার মতো হবে, যে ২৯ শাবান একা রমজানের চাঁদ দেখেছে। কিন্তু তার সাক্ষ্য গৃহীত হয়নি। সে নিজে চাঁদ দেখার কারণে তার ওপর রোজা রাখা ওয়াজিব হয়ে যাবে যদিও অন্য কারও ওপর রাখা ওয়াজিব হবে না। যার কারণে অন্যদের থেকে তার একটি রোজা বেশি হয়ে যাবে। এখন যদি ২৯ রোজার দিন ঈদুল ফিতরের চাঁদ না দেখা যায়, তাহলে তাকেও অন্যদের সঙ্গে ৩০তম রোজা অর্থাৎ তার ৩১তম রোজা রাখতে হবে। এ রোজাটি রাখা তার ওপর ওয়াজিব হবে। এটা বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। (সুনানুত তিরমিজি : হাদিস নং-৬৯৭, মাবসূত লিসসারাখসী-৩/৭৯, রহিমিয়া-৭/২১৫)।
লেখক : প্রধান মুফতি ও শাইখুল হাদিস, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া
বিজ্ঞাপন