Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কি জায়েজ?

Icon

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কি জায়েজ?

বিজ্ঞাপন

বিয়ে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং আমানত। বর্তমান সমাজে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা এবং অস্পষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই এই সংবেদনশীল বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের জন্য স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইসলাম কি একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়?

ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে একজন পুরুষকে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

‘তোমাদের কাছে নারীদের মধ্যে যারা ভালো লাগে, তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না—তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩)

কুরআনুল কারিমের এই আয়াত সুস্পষ্ট করে দেয় যে, একাধিক বিয়ে ইসলামে কোন বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এটি একটি অনুমতি, যা ন্যায়বিচারের কঠোর শর্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আরও পড়ুন
দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি ফরজ?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কি বৈধ? ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ বা শর্ত নয়। যদি বিয়ের মৌলিক শর্তসমূহ (সাক্ষী, ইজাব-কবুল ও মোহরানা) পূর্ণ হয়, তবে অনুমতি ছাড়াও সেই বিয়ে বৈধ হবে।

তবে ইসলামের শিক্ষা এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে যে দায়িত্ব/শর্ত বা বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে—

ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব— মূল শর্ত

একাধিক বিয়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ন্যায়বিচার। শুধু ভরণপোষণ নয়, বরং সময়, দায়িত্ব, আচরণ ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণতা জরুরি। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন—

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ

‘তোমরা নারীদের মধ্যে পুরোপুরি ন্যায়বিচার করতে কখনোই সক্ষম হবে না, যদিও তোমরা চেষ্টা কর।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১২৯)

এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে দেয়— ন্যায়বিচার করা কতটা কঠিন। তাই যার মধ্যে এই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নেই, তার জন্য একাধিক বিয়ের পথে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

এ বিষয়ে রাজধানী ঢাকার আফতাবনগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলূম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি মোহাম্মদ আলী বলেন, শরয়ি কারণ পাওয়া গেলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে। শরয়ি কারণ হলো, প্রথম স্ত্রী অবাধ্য, শারীরিক সম্পর্ক করতে পারছে না, প্রথম স্ত্রী অনেক অসুস্থ, যার কারণে স্বামীর গুনাহ হওয়ার সম্ভবনা দেখা দেয়, প্রথম স্ত্রী লাগামহীন, তখন অবশ্যই একজন আলেমের শরণাপন্ন হবে। তার অবস্থা জানাবে, আলেমের পরামর্শ নিয়ে অন্য বিয়ে করবে। 

আর প্রথম স্ত্রীর কোনো ধরণের সমস্যা না থাকলে, শরয়ি কোনো ওজর না থাকলে তারজন্য একাধিক বিয়ে করা জায়েজই নাই। কারণ প্রথম স্ত্রীর সমস্যা থাকলেই একাধিক বিয়ে করতে পারবে, যদি তাদের প্রতি বৈষম্যহীনভাবে পরিচালনা করতে পারে। এটাই কোরআনের নির্দেশ। প্রথম স্ত্রীর কোনো সমস্যা না থাকলে, তখন দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেলেই অশান্তি সৃষ্টি হয়। এখানেই বৈষম্যগুলো দেখা দেয়। এটা কুরআনের নির্দেশ না। 

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলেও বিয়ে হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি তখনি প্রদান করেছে, যখন উভয় স্ত্রীর হক সমানভাবে, কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়া আদায় করতে পারবে, তখন। সাম্যতা বজায় রাখতে না পারলে, কিংবা হক আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিবাহ করা জায়েজ নয়।

যদিও অনুমতি ছাড়াই বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নেওয়াই বাঞ্ছনীয়। যেহেতু স্ত্রীকে খুশি রাখাও স্বামীর একটি দায়িত্ব। নবীজী এ বিষয়ে খুবই গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, আমার নিকট হতে নারীদের সঙ্গে সদাচরণের উপদেশ গ্রহণ কর। তাদেরকে পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। হাড়ের মধ্যে সর্বাধিক বাঁকা হাড় হলো উপরেরটি। (সেই হাড় হতেই নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে)। অতএব তুমি যদি তা সোজা করতে চাও তবে ভেঙে ফেলবে। আর ওইভাবে ফেলে রাখলে সর্বদা উহা বাঁকাই থাকবে; সুতরাং তোমরা নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। (বুখারি, হাদিস ৫১৮৬)

ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে বা বহু বিবাহে উৎসাহিত করে তখনই যখন সব দিক দিয়ে শান্তি বজায় রেখে, প্রথম স্ত্রীর খুশি মতে বিয়ে করতে পারবে। কোরআনের ভাষায় অবশ্যই সমতা বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথমজনকে অবহেলিত অবস্থায় রেখে যাওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। আর ভরণপোষণ দিতে না পারলে তো দ্বিতীয় বিয়েতে যেতেই পারবে না।

হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, মুমিনদের মধ্যে পূর্ণতর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার আচার আচারণ উত্তম। আর তোমাদের মাঝে উত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীদের কাছে উত্তম। (ইবনে হিব্বান, হাদিস ৪১৭৬)

হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, মুমিনদের মাঝে সেই ব্যক্তি অধিকতর পূর্ণ মুমিন, যে ব্যক্তি সদাচারী এবং নিজ পরিবারের জন্য কোমল এবং অনুগ্রহশীল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪২০৪, তিরমিজি, হাদিস ২৬১২) হাদিসগুলো পর্যলোচনা করলে বুঝা যায়, দ্বিতীয় বিয়ের সময় প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেয়াটাই জরুরি।

গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে— ইসলাম কী বলে?

গোপনে বিয়ে করা শরিয়তের দৃষ্টিতে তখনই অবৈধ হবে, যদি—

বিবাহের মৌলিক শর্ত (ইজাব-কবুল, সাক্ষী, মহর) পূরণ না হয়

বা প্রথম স্ত্রীর হক নষ্ট হয়

তবে বাস্তবতায় গোপন বিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই—

অন্যায়

অবিচার

পারিবারিক ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ইসলাম সমর্থন করে না।

নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের জায়গা

ইসলাম কেবল বৈধতা শেখায় না; বরং দায়িত্ববোধও শেখায়। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ফরজ না হলেও—

তাকে জানানো

তার কষ্ট বোঝা

ন্যায্যতা নিশ্চিত করা— এসবই তাকওয়া ও উত্তম আচরণের অংশ।

হজরত ওমর (রা.) বলতেন— ‘ন্যায়বিচারই শাসন ও সম্পর্কের মূল ভিত্তি।’

দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরিয়তের দৃষ্টিতে ফরজ নয়—এটি সত্য। তবে এটাও সত্য যে, ইসলামের শিক্ষা শুধু আইনি বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা করবে, তার উচিত—

নিজের সক্ষমতা যাচাই করা

আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা মনে রাখা

প্রথম স্ত্রীর হক ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো

কারণ একদিন আল্লাহর সামনে শুধু বিয়ের বৈধতা নয়— ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের হিসাবও দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ, তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে পারিবারিক জীবন পরিচালনার তৌফিক দিন। আমিন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার