Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

মানবতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ— অমুসলিমদের প্রতি নবীজির (সা.) আচরণ

Icon

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

মানবতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ— অমুসলিমদের প্রতি নবীজির (সা.) আচরণ

বিজ্ঞাপন

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন দয়া, সহমর্মিতা ও উত্তম চরিত্রের জীবন্ত প্রতীক। তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল ভালোবাসা, ন্যায়, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা। আজকের পৃথিবীতে ধর্ম, মত ও পরিচয়ের ভিন্নতার কারণে মানুষ যখন বিভেদ ও বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ে, তখন নবীজি (সা.)–এর জীবন আমাদের সামনে অনন্য আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি অমুসলিমদের প্রতিও ছিলেন সদয়, সম্মানজনক ও সহানুভূতিশীল। তাঁর আচরণে কখনো প্রতিশোধ, অহংকার বা ঘৃণা স্থান পায়নি। বরং মহান চরিত্র ও ধৈর্যের মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

‘আমি তো আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ১০৭)

অমুসলিমদের প্রতি নবীজির (সা.) আচরণ

অমুসলিমদের সঙ্গে নবীজি (সা.)–এর মহান আচরণের দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলো—

১. নবীজির (সা.) অমুসলিম মেহমান

একবার এক অমুসলিম ব্যক্তি রাতে নবীজি (সা.)–এর ঘরে মেহমান হন। রাতে তাঁর সামনে খাবার পরিবেশন করা হলে তিনি সব খাবার একাই খেয়ে ফেলেন। এরপর নবীজি (সা.)–এর পবিত্র বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন।

এদিকে নবীজি (সা.) না খেয়েই রাত কাটালেন। সকালে তিনি মেহমানের খোঁজ নিতে এসে দেখলেন, মেহমান ঘরে নেই। সম্ভবত অসুস্থতার কারণে পুরো ঘর নোংরা হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ রাগান্বিত হলেও নবীজি (সা.) রাগ করলেন না। বরং আফসোস করতে লাগলেন যে, অসুস্থ অবস্থায় তিনি তার মেহমানের সেবা করতে পারেননি।

রাতে তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার সময় মেহমান নিজের তরবারি ফেলে গিয়েছিলেন। নবীজি (সা.) সেটি যত্ন করে রেখে দিলেন এবং তার অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর লোকটি তরবারি নিতে ফিরে এলে নবীজি (সা.) অত্যন্ত কোমলভাবে তার খোঁজখবর নিলেন এবং বললেন—

‘রাতে আমার বাড়ির খাবার খেয়ে তোমার অসুস্থতা হয়েছে। তুমি আমাকে ডাকলেই আমি তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম। তুমি কষ্ট পেয়েছ, আমাকে ক্ষমা করে দিও। এই নাও তোমার তরবারি।’

নবীজি (সা.)-এর এই আচরণে অমুসলিম ব্যক্তিটি বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন—

‘যাঁর এক নির্দেশেই আমার জীবন শেষ হয়ে যেতে পারত, তিনি আমার সঙ্গে এত বিনয় ও দয়া দেখাচ্ছেন! নিশ্চয়ই তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন।’

এরপর তিনি নবীজি (সা.)–এর সামনে তরবারি রেখে ক্ষমা চান এবং কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। (দালাইলুন নুবুওয়াহ, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১০০)

আরও পড়ুন
২. ইহুদি পণ্ডিতের ঋণ ও নবীজির (সা.) ধৈর্য

যায়েদ নামে একজন প্রখ্যাত ইহুদি আলেম ছিলেন। তিনি ছিলেন ধনী ও জ্ঞানী ব্যক্তি। নবীজি (সা.)–কে দেখার পর তার নবুয়্যতের বহু নিদর্শন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তবে দুটি বিষয় তার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি—

> নবীজি (সা.)–এর ধৈর্য কি সত্যিই রাগের ওপর বিজয়ী?

> মানুষের রূঢ় আচরণেও তিনি কি শান্ত থাকতে পারেন?

এই দুটি বিষয় যাচাই করার জন্য তিনি এক অভিনব পরিকল্পনা করলেন। কী সেই পরিকল্পনা?

যায়েদ ইবনে সানাহ—একজন ইহুদি পণ্ডিত। সত্যের সন্ধান ছিল তার অন্তরে, কিন্তু সে তখনো অন্ধকারেই পথ খুঁজছিল। একদিন তিনি প্রিয় নবীজি (সা.)-কে কিছু ঋণ দিয়েছিলেন। পরিশোধের নির্ধারিত সময় তখনো বাকি—আরো তিন দিন।

একদিন নবীজি (সা.) হেঁটে যাচ্ছেন। সাথে আছেন হজরত ওমর (রা.)। পথের মাঝে হঠাৎ সেই ইহুদির সঙ্গে দেখা। আচমকা সে তেড়ে এল! নবীজি (সা.)-এর কাপড় শক্ত করে ধরে ফেলল। তার কণ্ঠে রুক্ষতা, ভাষায় কঠোরতা, সে বলছিল—

‘তোমরা বনি আবদুল মুত্তালিবের লোকেরা ঋণ পরিশোধে বড় টালবাহানা কর!’

এই দৃশ্য সহ্য করা কি সহজ? প্রিয় নবীজির (সা.) সঙ্গে এমন অসম্মানজনক আচরণ! বীরত্ব ও গাম্ভীর্যের প্রতীক হজরত ওমর (রা.) ক্রোধে ফেটে পড়লেন। যেন বজ্রনিনাদে আকাশ কেঁপে উঠল।

কিন্তু আশ্চর্য! এ উত্তেজনার মুহূর্তে নবীজি (সা.)-এর ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মৃদু হাসি—শান্ত, প্রশান্ত, আলোকময়। তারপর কোমল কণ্ঠে বললেন—

‘হে ওমর! আমি ও সে— আমরা দুজনই তোমার কাছে অন্য কিছুর প্রত্যাশী ছিলাম। তুমি আমাকে বলতে— আমি যেন সুন্দরভাবে ঋণ পরিশোধ করি। আর তাকে বলতে— সে যেন ভদ্রভাবে তার পাওনা চায়।’

সুবহানাল্লাহ! কী অপূর্ব শিক্ষা! কী অনুপম বিনয়! নিজের সাহাবিকেও তিনি নরমভাবে শিখিয়ে দিলেন আদব ও শালীনতার পাঠ।

এরপর নবীজি (সা.) জানালেন— ঋণ পরিশোধের এখনো তিন দিন বাকি। তবুও তিনি হজরত ওমর (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন—

‘তার পাওনা পরিশোধ করে দাও, আর এই তিন দিনের বিনিময়ে তাকে আরো ত্রিশ সা পরিমাণ বাড়িয়ে দাও।’

এ যেন দয়ার সাগর থেকে উদারতার ঢেউ!

এই মহানুভবতা বিদীর্ণ করে দিল যায়েদ ইবনে সানাহর হৃদয়ের কঠিন আবরণ। সে ভাবতে লাগল—

আমি অন্যায় করেছি। সময়ের আগেই দাবি করেছি। তাও কেমন রূঢ়ভাবে! একজন সম্মানিত মানুষকে এভাবে কাপড় চেপে ধরা— এ কেমন আচরণ! অথচ তিনি কিছুই বললেন না! বরং উল্টো আমাকে আরও বেশি দিলেন!

এমন মানুষ কি পৃথিবীতে আছে?

হজরত ওমর (রা.) যায়েদের সঙ্গে গিয়ে সব পরিশোধ করলেন। তখন যায়েদ বললেন— ‘আমি ইচ্ছা করেই এমন আচরণ করেছি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, মানুষের রূঢ় আচরণেও তিনি ধৈর্য ধারণ করতে পারেন কি না। এখন আমি নিশ্চিত হলাম, তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসুল।’

এরপর তিনি নবীজি (সা.)–এর দরবারে এসে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। (মুসতাদরাকে হাকেম ২২৩৭, ৬৫৪৭; মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১৩৮৯৮)

নবীজি (সা.)–এর জীবন ছিল মানবতার সর্বোচ্চ আদর্শ। তিনি প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা, কঠোরতার বদলে কোমলতা এবং বিদ্বেষের বদলে ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছেন। তার আচরণ শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; বরং সব মানুষের জন্য অনুসরণীয়।

আজকের সমাজে মতভেদ, ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার মাঝে নবীজি (সা.)–এর মহান চরিত্র আমাদের শেখায়— মানুষের হৃদয় জয় করা যায় সুন্দর আচরণ, ধৈর্য ও মানবিকতার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নবীজি (সা.)–এর উত্তম চরিত্র অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার