মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম তাহাজ্জুদ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজও এটি। মহানবী (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।’ (মুসলিম: ১১৬৩)
রাতের শেষভাগে যে নামাজ আদায় করা হয়, সেটিই মূলত তাহাজ্জুদ। তাহাজ্জুদ একটি নফল ইবাদত। তাহাজ্জুদ নেককার ও উত্তম বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গুরুত্বের সঙ্গে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। তাহাজ্জুদ আদায়কারীর প্রশংসায় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন-
تَتَجَافٰی جُنُوۡبُهُمۡ عَنِ الۡمَضَاجِعِ یَدۡعُوۡنَ رَبَّهُمۡ خَوۡفًا وَّ طَمَعًا
‘তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশঙ্কায়..।’ (সুরা সাজদা: ১৬)
প্রিয়নবী (সা.) জীবনে কখনও তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ত্যাগ করেননি। তবে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এটি সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা বা নফল। অর্থাৎ এ নামাজ আদায় করলে অশেষ পুণ্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, কিন্তু আদায় করতে না পারলে কোনো গুনাহ হবে না।
তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম
সুরা ফাতেহার পর যেকোনো সুরা দিয়েই এ নামাজ পড়া যায়। প্রিয়নবী (স.) যথাসম্ভব লম্বা কেরাত, লম্বা রুকু ও সেজদার সঙ্গে একান্ত নিবিষ্ট মনে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। তাই লম্বা কেরাতে তাহাজ্জুদ আদায় করা উত্তম। কেরাত উঁচু বা নিচু উভয় আওয়াজে পড়া জায়েজ আছে। তবে কারও কষ্টের কারণ হলে চুপিচুপি পড়া কর্তব্য।
দুই দুই রাকাত করে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে হয়। দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নিয়ত করার পর তাকবিরে তাহরিমা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে নিয়ত বেঁধে সাধারণ নফল নামাজের মতোই ছানা, সুরা ফাতেহা এবং অন্য সুরা মিলিয়ে এই নামাজ পড়তে হয়। রুকু, সেজদা, তাশাহুদ, দরুদ, দোয়া মাছুরা পড়ে সালাম ফেরানো পর্যন্ত সবকিছুই অন্য নফল নামাজের মতোই।
এভাবে দুই রাকাআত করে আট রাকাআত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা উত্তম। যদি এশার নামাজের পরে বিতরের নামাজ পড়ে থাকেন, তবে তাহাজ্জুদ নামাজশেষে বিতর পড়ার দরকার নেই।
তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত
নিয়ত মনের ব্যাপার। তাই মনে মনে দুই রাকাত তাহাজ্জুদের সংকল্প করলেই নিয়ত হয়ে যায়। নির্দিষ্ট শব্দগুচ্ছ উচ্চারণের মাধ্যমে নিয়ত করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে আরবিতে এভাবে করা যায়—
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ رَكَعَتِى التَّهَجُّدِ - اَللهُ اَكْبَر
উচ্চারণ: ‘নাওয়াইতুয়ান উছাল্লিয়া রাকআতিত্তাহাজ্জুদি আল্লাহু আকবর।’
বাংলায়: দুই রাকাআত তাহাজ্জুদের নিয়ত করছি.. অতঃপর ‘আল্লাহু আকবর’ বলে নিয়ত বেঁধে নামাজ শুরু করা।
তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাতসংখ্যা
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজ দুই রাকাত করে আদায় করতেন। তিনি কখনো চার রাকাত, কখনো আট রাকাত এবং কখনো ১২ রাকাত পড়েছেন। কিন্তু কেউ যদি এ নামাজ দুই রাকাত আদায় করেন, তাহলেও তার তাহাজ্জুদ আদায় হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিকাংশ সময় ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তেন। তাই ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়াই উত্তম। তবে এটি আবশ্যক নয়।
তাহাজ্জুদ নামাজের উত্তম সময়
রাতের শেষ প্রহরে ঘুম থেকে ওঠার পর তাহাজ্জুদ পড়া সবচেয়ে উত্তম। তবে এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত এই নামাজ পড়া যায়। আর এতে তাহাজ্জুদের ফজিলত লাভ হয়। কেননা তাহাজ্জুদ নামাজের মূল সময় এশার নামাজের পর থেকেই শুরু হয়, যদিও উত্তম সময় হলো ঘুম থেকে ওঠার পর।
হজরত আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তাহাজ্জুদ নামাজ (রাতের) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতেন। তারপর নামাজে দাঁড়াতেন এবং সেহরির পূর্বক্ষণে বিতির আদায় করতেন। এরপর প্রয়োজন মনে করলে বিছানায় আসতেন। তারপর আজানের শব্দ শুনে জেগে উঠতেন এবং অপবিত্র হলে সর্বাগ্রে পানি বইয়ে গোসল করে নিতেন নতুবা অজু করতেন। তারপর নামাজ আদায় করতেন। (নাসাঈ ১৬৮০; মুসনাদ আহমদ ২৫৪৭৪)
তাই ঘুম ভেঙে তাহাজ্জুদ পড়া অধিক ফজিলতপূর্ণ। সুতরাং যে তাহাজ্জুদ আদায় করতে চায়, সে এশার নামাজ শেষে ঘুমিয়ে পড়বে। চাই তা অল্প সময়ের জন্য হোক। এরপর রাতের মধ্য ভাগে জেগে অল্প সময়ে দুই রাকাত নামাজ পড়বে। এরপর যত রাকাত ইচ্ছে নামাজ আদায় করবে, তবে নামাজ হতে হবে দুই রাকাত করে। দুই রাকাত শেষে সালাম ফিরাবে, আবার দুই রাকাত পড়বে..। এভাবে যত রাকাত সম্ভব, তাহাজ্জুদ আদায়ের পর বিতির নামাজ আদায় করবে। (শায়খ বিন বাজ: কাইফিয়্যাতু সালাতুত তাহাজ্জুদ ওয়া কিয়ামুল লাইল; ফতোয়া নুরুন আলাদ দারব, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ২১-২৪)
ঘুম থেকে উঠার সম্ভাবনা না থাকলে যা করবেন
ঘুম থেকে জাগার সম্ভাবনা না থাকলে এশার নামাজের পর দুই রাকাত সুন্নত ও বিতরের আগে তা পড়ে নেওয়া জায়েজ আছে এবং এই দুই রাকাত নামাজের ফজিলতও বর্ণিত হয়েছে হাদিসে।
হজরত সাউবান (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রাত্রি জাগরণ কষ্টকর ও ভারী জিনিস, তাই তোমরা যখন (শোয়ার আগে) বিতির পড়বে, তখন দুই রাকাত (নফল) নামাজ পড়ে নেবে। পরে শেষ রাতে উঠতে পারলে ভালো, অন্যথায় এই দুই রাকাতই ‘কিয়ামুল লাইল’-এর ফজিলত লাভের উপায় হবে।’ (দারেমি ১৬৩৫, ইবনে খুজাইমা ১১০৬, তাহাবি ২০১১)
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা উচিত। কেননা তা তোমাদের পূর্বেকার সজ্জন ব্যক্তিদের প্রতীক এবং তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। নামাজ গুনাহসমূহ বিমোচনকারী এবং গুনাহের প্রতিবন্ধক।’ (তিরমিজি ৩৫৪৯, ইবনে খুজাইমা ১০৭৫)
তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনে তাহাজ্জুদসহ রাতের নফল ইবাদত-বন্দেগির বিকল্প নেই। রাত জেগে নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার পাশাপাশি নফল ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখা মুমিন মুসলমানের উচিত।