বিজ্ঞাপন
আপনার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেলে কী করবেন?
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম
বিজ্ঞাপন
ভোট একটি উৎসব, নাগরিক অধিকার আদায়ের আয়োজন। যা আসে ৫ বছর পর পর। যেমনটি আসছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। ধরুন ভোটের দিন অনেক উৎসাহ নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে অবশেষে নিজের পছন্দের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানানোর সুযোগ পেলেন; তখন যদি দেখেন আপনার ভোটটি আগেই কেউ দিয়ে গেছে। অর্থাৎ জাল ভোট দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে কী করবেন?
নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক সময় ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন তার ভোট এরইমধ্যে অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার হরণেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন তোলে। বাংলাদেশে এ ধরনের ভোট জালিয়াতি একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকারও রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নেওয়া বা অন্যের নামে ভোট দেওয়া সরাসরি সংবিধানবিরোধী কাজ। ভোটার উপস্থিত না থাকলে তার নামে ভোট দেওয়া হলে সেটিকে ভোট জালিয়াতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিলে প্রধানত যে আইনগুলো প্রযোজ্য হয়, তার মধ্যে রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আরপিও ১৯৭২। এই আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি যদি নিজে ভোটার না হয়, অথচ অন্যের পরিচয়ে ভোট দেয় বা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা জেনেশুনে ভুয়া ভোটগ্রহণ করলে তিনিও দায়মুক্তি পাবেন না। এই অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ীও ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অন্যের পরিচয়ে ভোট দেওয়ার ঘটনা প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হয়। সে ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪১৯ ও ৪২০ ধারায় প্রতারণা ও প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা যেতে পারে। পাশাপাশি জাল পরিচয়পত্র বা স্বাক্ষর ব্যবহার করা হলে ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারার প্রয়োগও হতে পারে।
ভোটার যদি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন যে তার ভোট আগেই দেওয়া হয়েছে, তাহলে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো সঙ্গে সঙ্গে প্রিজাইডিং অফিসারকে বিষয়টি জানানো। মৌখিকভাবে জানানোর পাশাপাশি লিখিত অভিযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রিজাইডিং অফিসারকে ভোটার তালিকায় বিষয়টি মন্তব্য আকারে নোট করার জন্য অনুরোধ করতে হবে। এই নোট ভবিষ্যতে অভিযোগ বা মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এরপর সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করা যেতে পারে। অভিযোগপত্রে ভোটারের নাম, ভোটার নম্বর, ভোটকেন্দ্রের নাম, কেন্দ্র নম্বর, সময় ও ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করা উচিত। নির্বাচন কর্মকর্তা প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারেন।
আইনি প্রতিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা। জিডির মাধ্যমে ঘটনার একটি সরকারি রেকর্ড তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে মামলা বা তদন্তের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী সরাসরি মামলা করার সুযোগও রয়েছে। মামলায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো উল্লেখ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করা যেতে পারে। যদি ভোট জালিয়াতির কারণে কোনো নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হয়, বিশেষ করে প্রার্থী বা তার সমর্থকদের ক্ষেত্রে, তাহলে নির্বাচন ফল গেজেট আকারে প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করা যায়। ট্রাইব্যুনাল তদন্ত শেষে প্রয়োজনে নির্বাচন বাতিল বা পুনর্নির্বাচনের আদেশ দিতে পারে।
ভোট জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণে ভোটার তালিকায় থাকা স্বাক্ষর বা টিপসই, ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই অভিযোগ করার সময় যত বেশি তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়, ততই মামলার শক্তি বাড়ে।
কারো ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার বিষয় নয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। সচেতন ভোটার হিসেবে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত ও সঠিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই ভোটাধিকার রক্ষা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন