Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

হাতিয়ায় শুক্রবার রাতে কী ঘটেছে? কেন এতো আলোচনা?

Icon

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২৬ এএম

হাতিয়ায় শুক্রবার রাতে কী ঘটেছে? কেন এতো আলোচনা?

বিজ্ঞাপন

নোয়াখালীর হাতিয়ায় নির্বাচনের পরদিন একজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। ওই নারী অভিযোগ করেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কারণে তাকে ধর্ষণ ও লাঞ্চিত করা হয়েছে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে যখন এই অভিযোগ করছিলেন, সে সময়ের ভিডিও বিবিসির কাছে এসেছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি এ-ও অভিযোগ করছিলেন যে, বৃহস্পতিবার নির্বাচনের পর থেকেই তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিলো।

শুক্রবার রাতে তার স্বামীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে ওই নারী অভিযোগ এনেছেন, তারা বিএনপির কর্মী বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই নারী এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নোয়াখালীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্ট চিকিৎসক ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, শনিবার বিকাল পাঁচটার দিকে একজন মহিলা ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তার শারীরে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়েছে।

কিন্তু ধর্ষণ হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। এই পরীক্ষার জন্য পুলিশ বা আদালতের চাহিদা বা অনুমতি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন ওই চিকিৎসক।

এদিকে, রোববার সকালে দশটায় নোয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার টি এম মোশাররফ হোসেন ও জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ওই নারীকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

তবে, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এখনো কোনো মামলা হয়নি এবং ধর্ষণের পরীক্ষার জন্য হাসপাতালেও পুলিশ থেকে কোনো পত্র দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

এরই মধ্যে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এমন অভিযোগের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, ঘটনাটি তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতার কাছে তুলবেন। একইসাথে দলটির অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এদিকে, হাতিয়ার ওই এলাকাটি নোয়াখালী - ৬ আসনে পড়েছে। এই আসনে নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন এনসিপির নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদ।

এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হান্নান মাসউদ। ঘটনাটির তদন্তের আগেই নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন মন্তব্য করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মি. মাসউদ।

যদিও বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচন পরবর্তীতে একটি ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে তদন্ত হওয়ার আগেই পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ওই নারীর সাথে মোবাইলে কথা বলে আইনী সহযোগীতাসহ সব ধরনের সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছেন।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিকেলে গণমাধ্যমকে হাতিয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন।

শুক্রবার রাতে কী ঘটেছে?

ওই নারী নোয়াখালীর নলেরচর এলাকার একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা বলে জানান। সরকারের তৈরি এই আশ্রয়ন প্রকল্পগুলোতে ভূমিহীন মানুষের বাসস্থান। শনিবার বিকেলে নোয়াখালীর জেনারেল হাসপাতালে স্থানীয় সাংবাদিকরা ওই নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী দাবি করেন, নির্বাচনের দিন বৃহস্পতিবার থেকে হুমকি পাওয়ায় শুক্রবার রাতে চাচাতো বোনের বাড়িতে চলে যান তিনি। সেখানেও ভাংচুর ও হামলা চালানো হয়।

পরে তার স্বামী তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানে রাত ১১টার দিকে তিন ব্যক্তি এসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এসব কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এই নারী। তিনি দাবি করেন, শুক্রবার রাতে ধর্ষণ করার পর আবার শনিবার ভোর ছয়টা সাড়ে ছয়টার দিকে আবার ১০-১২ জন ব্যক্তি আসেন।

সেসময় তার স্বামীকে মারধর করে আবার তাকে নিয়ে যায় বলে দাবি করেন এই নারী। এই ঘটনার পর ওই নারীর নিরাপত্তায় হাসপাতালে সাত সদস্যের একটি পুলিশের দল মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে, ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ "বানোয়াট ও মিথ্যা"।

'ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনী কর্তৃপক্ষের চাহিদা লাগে'

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্ট ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ধর্ষণের পরীক্ষার জন্য পুলিশ বা আদালতের রিকুইজিশন লাগে।

বিবিসি বাংলাকে মি. চৌধুরী বলেন, "আমরা যথারীতি ওনাকে হাসপাতালে ভর্তি করলাম। পরে চিকিৎসার অংশ হিসেবে ওনাকে যতটুকু পরীক্ষা করার সেটা পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইনী কর্তৃপক্ষের চাহিদা লাগে, রিকুইজিশন লাগে ধর্ষণের বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য। সেটি আসলে ফরমালি আমরা এখনো পাইনি। এসপি সাহেবের সাথে কথা হয়েছে আমার। ওনারা যদি আমাদের কাছে রিকুইজিশন পাঠান তাহলে আমরা পরীক্ষা করতে পারবো।"

এই চিকিৎসক জানান, রোববার সকাল দশটার দিকে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক ওই নারীকে দেখতে হাসপাতালে গেলে চাহিদাপত্রের বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

"আমি ওনাকে বলেছি, ফরমাল পরীক্ষার জন্য আমাদের তো আইনী কর্তৃপক্ষের চাহিদাপত্র লাগে। আপনারা দেবেন বা ভিকটিম যদি কোর্টে মামলা করে, আমাদের কাছে চাইতে হবে। তখন আমরা একটা মেডিকেল বোর্ড করে যাবতীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করে পরীক্ষা শেষে একটা প্রতিবেদন দিতে পারবো" বলেন মি. চৌধুরী।

তবে, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে হাসপাতালে কোনো চাহিদাপত্র দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

পুলিশ কী বলছে?

নোয়াখালীর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ওই নারীর সাথে সকালেই দেখা করেছেন পুলিশ সুপার টি এম মোশাররফ হোসেন।

এ বিষয়ে জানতে কয়েকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, নোয়াখালী সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লিয়াকত আকবর বিবিসি বাংলাকে জানান, শনিবার আশ্রয়ন প্রকল্পের ওই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তিনি।

"আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে মারধরের আমরা সত্যতা পেয়েছি। কিন্তু ধর্ষণের বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি" বলেন মি. আকবর।

নোয়াখালী – ৬ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ দাবি করেন, নির্বাচনের ফলাফলের পর ওই এলাকায় ব্যাপক হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছে।

মি. মাসউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "মহিলার অভিযোগ সত্যও হইতে পারে, মিথ্যাও হইতে পারে। এটার আমার ধারণা নাই। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, লিগ্যাল প্রসেসেতো যাবে। যেই নিয়মে হওয়ার কথা, মহিলার আগে শারীরিক পরীক্ষা করবে তারপর মন্তব্য করবে। তার আগে কিভাবে এসপি মন্তব্য করে?"

এদিকে, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছেন।

মি. নাসিরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে তিনি এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করেছেন।

"সকল প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ, ভিডিও বক্তব্য, চিকিৎসা নথি এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিস্তারিত যাচাই-বাছাই পর্যালোচনা করে এ পর্যন্ত হাতিয়ার ঘটনাটি অনেকের কাছেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত বয়ান বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে" ফেসবুকে লিখেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার