Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

জাতীয়

নতুন গভর্নর নিজেই ছিলেন ঋণখেলাপি

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৬ পিএম

নতুন গভর্নর নিজেই ছিলেন ঋণখেলাপি

বিজ্ঞাপন

দেশের ১৪তম গভর্নর হিসেবে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের পর থেকেই আর্থিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। সামাজিক মাধ্যমে কেউ তাকে ‘ঋণখেলাপি’ আখ্যা দিচ্ছেন, আবার কেউ বলছেন—আইনের চোখে এখন আর সেই তকমা প্রযোজ্য নয়। তাহলে বাস্তবতা কী?

পুরোনো খেলাপি ঋণের ইতিহাস কি এখনও তাকে প্রশ্নের মুখে রাখে, নাকি পুনঃতফসিলের মাধ্যমে বদলে গেছে তার অবস্থান?

মোস্তাকুর রহমান তৈরি পোশাক খাতের একজন উদ্যোক্তা। তিনি বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য এবং নারায়ণগঞ্জভিত্তিক হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জানা গেছে, মোস্তাকুর রহমান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৯ কোটি ২ লাখ টাকার একটি ঋণ একসময় খেলাপি হয়ে পড়েছিল। গত বছরের এপ্রিলে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার আওতায় ওই ঋণ খেলাপিমুক্ত হতে পুনঃতফসিলের আবেদন করেন। পরে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট পরিশোধের মাধ্যমে বিশেষ বিবেচনায় ঋণটি ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ পান।

যদিও তিনি দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিল চেয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা অনুমোদন না করে ১০ বছরের সীমা নির্ধারণ করে।

ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল অনুমোদিত হলে এবং গ্রাহক শর্ত মেনে চললে তাকে আর খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয় না। সেই হিসেবে বর্তমানে আইনগতভাবে মোস্তাকুর রহমানকে ঋণখেলাপি বলা যাবে না। তবে এখানেই থেমে নেই বিতর্ক।

বিশেষ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে অনেক ঋণগ্রহীতা অতিরিক্ত অর্থ, জরিমানা বা সুদ গুনতে হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সে ক্ষেত্রে নতুন গভর্নর কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, তিনি ন্যূনতম ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ১০ বছরের পুনঃতফসিল সুবিধা পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, দেশে ব্যবসায়িক ক্ষতি ও আর্থিক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই নীতিমালার আলোকে একাধিক প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিলের সুযোগ পেয়েছে। তবে আর্থিক খাতের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও সমতার প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে সরকার বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে (মোস্তাকুর রহমান) দেশের ১৪তম গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। একইসঙ্গে আগের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর–এর অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। নতুন গভর্নরকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক ছিন্নের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মোস্তাকুর রহমান পেশায় ব্যবসায়ী ও হিসাববিদ। এর মাধ্যমে দেশে প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।

মোস্তাকুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি আবাসন খাতেও তার ব্যবসা রয়েছে। বিজিএমইএ, রিহ্যাব, আটাব ও ঢাকা চেম্বারের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেছেন তিনি। করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিয়ে তিন দশকের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

সব মিলিয়ে বাস্তবতা হলো—ঋণ একসময় খেলাপি থাকলেও পুনঃতফসিলের শর্ত পূরণ হওয়ায় বর্তমানে আইনগতভাবে তিনি ঋণখেলাপি নন। তবে নীতিগত প্রশ্ন, বিশেষ সুবিধা ও আর্থিক খাতের নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে জনমনে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা সহজে থামার নয়। এখন সবার দৃষ্টি—গভর্নরের আসনে বসে তিনি কতটা দৃঢ়ভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

দিনভর যা ঘটলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে

একদিনেই উত্তাল হয়ে উঠল বাংলাদেশ ব্যাংক। সকাল থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ, পাল্টা সংবাদ সম্মেলন, পদত্যাগ বিতর্ক—সব মিলিয়ে দিনভর নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী থাকল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সকালে বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা ঘোষণা দেন, দাবি মানা না হলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে প্রতীকী কলমবিরতিতে যাবেন। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর–এর ‘স্বৈরাচারী’ আচরণের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এতে সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, তারা স্বায়ত্তশাসন চেয়েছেন, কিন্তু পেয়েছেন ‘স্বৈরশাসন’। ন্যায্য দাবিগুলো গভর্নরের কাছে একাধিকবার তুলে ধরা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি; বরং দমন-পীড়নের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শোকজ ও বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হলে বৃহত্তর কর্মসূচিতে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।

নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, গত সাত-আট মাস ধরে উত্থাপিত দাবিগুলো ছিল ন্যায্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, শোকজ নোটিশের জবাব দেওয়ার আগেই তিন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে এবং আলোচনার জন্য গভর্নরের সঙ্গে দেখা করার সুযোগও পাওয়া যায়নি। দাবি বাস্তবায়ন না হলে কলমবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর

প্রতিবাদ সভার কিছুক্ষণ পরই তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস রুলস মেনে চলা সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং নীতিমালার বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও সক্ষমতা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস হবে না বলেও জানান তিনি।

আর্থিক খাতে চলমান কাঠামোগত সংস্কার, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে বর্তমান প্রশাসনের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন গভর্নর।

পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদত্যাগ করতে তার ‘দুই সেকেন্ড’ লাগবে, তবে তিনি এসেছেন জাতির সেবা করতে এবং সংকটকালে দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় কর্তব্য হিসেবে।

দুপুর গড়াতেই বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—সরকার নতুন গভর্নর নিয়োগ দিতে যাচ্ছে।

সরিয়ে দেওয়ার খবর শুনে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা ছাড়াই গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয় ত্যাগ করেন। বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি; নিয়োগসংক্রান্ত খবর শুনেছেন মাত্র। নির্ধারিত সরকারি গাড়ি রেখে ব্যক্তিগত গাড়িতে তিনি ব্যাংক ত্যাগ করেন।

এর মধ্যেই আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে ‘মব’ করে বের করে দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্লোগান ও উত্তেজনার মধ্যেই তাকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। তারা ‘ধর ধর’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় আহসান উল্লার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে আসেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। এসময় তিনি অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করেন।

এছাড়া নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ২০/৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ঘটনাটিকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন সরকারের সময়ে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তিনি সবাইকে সংযম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।

সব মিলিয়ে দিনভর উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় অস্থির ছিল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার