বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় কোন জেলায়, কোথায়
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪০ এএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন একটি গুরুতর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ সালে এটিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও প্রতি বছরই এখনো শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।
বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বজ্রঝড়-বজ্রপাত হয় এবং এই দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি হয় দেশের উত্তর-পূর্ব দিকের অঞ্চল সিলেটে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে সিলেটেই। সর্বশেষ আজ ও গতকাল মিলে দেশের কয়েকটি জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কোথায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা শীর্ষে রয়েছে। জেলার ভেতরে জামালগঞ্জ উপজেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরাসহ আরও বেশ কয়েকটি জেলায় তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়। মূলত, ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেটে বজ্রপাত বেশি ঘটে।
কেন সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত কারণে সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি দেখা যায়। এই অঞ্চলে রয়েছে বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকা, যা থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। হাওড়ের জলীয় বাষ্প, পাহাড়ের বাধা, এবং ভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষ– এই তিনটি প্রধান কারণে সিলেট ও আশপাশের এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। আবহাওয়া অফিসের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বজ্রপাত দেশের প্রায় সব জেলাতেই প্রভাব ফেলেছে এবং আক্রান্ত জেলার সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস এবং উত্তর-পশ্চিম দিকের শুষ্ক গরম বাতাসের সংঘর্ষ এখানে বেশি ঘটে। এছাড়া উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল এই বাতাসের গতি বাধাগ্রস্ত করে উপরের দিকে তুলতে সাহায্য করে। ফলে দ্রুত ঘনীভূত হয়ে বজ্রমেঘ সৃষ্টি হয়, যা বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। এই দুই ধরনের বাতাসের মিলনস্থল হিসেবে সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দেশের কিছু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই উর্ধ্বগামী আর্দ্র বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হলে মেঘ তৈরি হয়, বিশেষ করে কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রমেঘ। এই প্রক্রিয়াই বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি অঞ্চল এবং হিমালয়ের পাদদেশ ঘিরে যে আবহাওয়াগত ব্যবস্থা তৈরি হয়, তার প্রভাবও বাংলাদেশে পড়ে। এসব অঞ্চল থেকে তৈরি হওয়া বজ্রমেঘ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বজ্রপাতের সময়কাল ও বিস্তৃতি
বাংলাদেশে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রঝড়ের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময় মোট বজ্রসহ ঝড়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ ঘটে। অন্যদিকে বর্ষাকাল, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘটে প্রায় ৫১ শতাংশ বজ্রপাত।
গত কয়েক বছরে দেশের প্রায় সব জেলাতেই বজ্রপাতের ঘটনা দেখা গেছে। কোনো কোনো বছরে ৫০টির বেশি জেলায় এই দুর্যোগ আঘাত হেনেছে, যা এর বিস্তৃতি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
কেন বাড়ছে প্রাণহানি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর বড় কারণ হলো মানুষের খোলা জায়গায় অবস্থান। কৃষক, জেলে বা দিনমজুররা ঝড়ের সময়ও মাঠ বা নদীতে থাকেন। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়
স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ। খোলা মাঠ, জলাশয় বা উঁচু গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বজ্রপাতের সময় মোবাইল টাওয়ার, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রয়োজনে বাইরে গেলে রাবারের জুতা ব্যবহার করা ভালো।
মাঠে থাকলে নিচু হয়ে বসে থাকতে হবে, দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। নৌকায় থাকলে দ্রুত ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। গাড়িতে থাকলে ধাতব অংশ স্পর্শ করা এড়িয়ে চলতে হবে
বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে এনে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি তাকে স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নেই
বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমেনি, বরং বিস্তৃতি বেড়েছে। বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাই প্রাণহানি কমানোর প্রধান উপায়।