Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা আবার প্রশ্নের মুখে

Icon

অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪৩ এএম

শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা আবার প্রশ্নের মুখে

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আজ যে দৃশ্যের মুখোমুখি হচ্ছি, তা একেবারেই ভিন্ন ও ভয়াবহ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে তাঁর নিজের ক্যাম্পাসে ছাত্ররা দৌড়াচ্ছে—পুলিশে দেয়ার জন্য নয় শুধু, মারার উদ্দেশ্যেও। এমন দৃশ্য কি পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায়? বাংলাদেশের আগে এমনটা ঘটেছে—এমন উদাহরণও শোনা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেছেন, এই জাতি প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর স্মরণ করে সেই ভয়াল ইতিহাস, যখন শিক্ষকদের ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, আর পরে হত্যা করা হয়েছিলো। শিক্ষক নিধন যে কোনো সমাজের জন্য কী অর্থ বহন করে—তা আমরা জানি, স্মরণ করি, শোক করি। অথচ আজ, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও, শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা আবার প্রশ্নের মুখে।

রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি একথা বলেন।

অধ্যাপক মামুন আরো বলেন, দেশটা এমন হয়ে যাচ্ছে কেনো—এই প্রশ্নটা আজ আর কেবল আবেগের নয়, গভীর উদ্বেগেরও। একসময় শোনা যেত, কোথাও কোনো স্কুলশিক্ষক নকল ধরেছেন কিংবা শাসন করেছেন বলে ক্ষুব্ধ কেউ সুযোগ পেয়ে শিক্ষককে আঘাত করেছে। এসব ঘটনা ছিল বিরল, নিন্দনীয় হলেও ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হতো। কলেজে অধ্যক্ষকে অপমান করা, অফিসে অবরুদ্ধ করা—এসব খবরও আমরা পড়েছি। কিন্তু আজ যে দৃশ্যের মুখোমুখি হচ্ছি, তা একেবারেই ভিন্ন ও ভয়াবহ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে তাঁর নিজের ক্যাম্পাসে ছাত্ররা দৌড়াচ্ছে—পুলিশে দেয়ার জন্য নয় শুধু, মারার উদ্দেশ্যেও। এমন দৃশ্য কি পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায়? বাংলাদেশের আগে এমনটা ঘটেছে—এমন উদাহরণও শোনা যায় না।

অধ্যাপক মামুন আরো বলেন, ৫ আগস্টের পর আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি নতুন, সুন্দর, সভ্য বাংলাদেশের—যেখানে আইনের শাসন থাকবে, যেখানে প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে, যেখানে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না। হ্যাঁ, এটাও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া সঠিক ছিল না। অনেকেই শিক্ষকতার পেশায় এসেছেন অথচ প্রকৃত অর্থে শিক্ষকতার যোগ্যতা বা দায়বদ্ধতা তাঁদের ছিল না। কেউ-কেউ শিক্ষকতার চেয়ে রাজনীতিতেই বেশি সময় দিয়েছেন—এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একবার কেউ নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত হলে, তিনি শিক্ষকই। যদি তিনি অন্যায় করে থাকেন, তার প্রতিকারের জন্য আইন আছে, প্রশাসনিক পথ আছে, বিচারপ্রক্রিয়া আছে। জঙ্গলের আইন কোনো সমাধান হতে পারে না।

ঢাবির এই অধ্যাপক আরো বলেন, একবার ভেবে দেখুন—ছাত্ররা শিক্ষকদের ধরার জন্য দৌড়াচ্ছে, এই দৃশ্যের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। এটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণ এমন ঘটনা একটিমাত্র নয়, একাধিক ক্যাম্পাসে ঘটেছে। এর অভিঘাত শুধু শিক্ষক সমাজে সীমাবদ্ধ থাকে না—এর ঢেউ গিয়ে লাগে অভিভাবকদের মনে।

অধ্যাপক মামুন আরো বলেন, এমনিতেই শিক্ষিত ও সচেতন অনেক বাবা–মা এখন আর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের প্রিয় সন্তানদের পাঠাতে আগ্রহী নন। কেনো নন? কারণ তাঁরা দেখেছেন—ক্যাম্পাসে ছাত্র হয়ে ছাত্রকে মারছে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করেছে। আর এখন যখন দেখা যাচ্ছে ছাত্ররা শিক্ষককেই দৌড়াচ্ছে, তখন সেই ভয় আরও বহুগুণে বাড়ে। এমন পরিবেশে কোনো অভিভাবক নিশ্চিন্ত মনে তাঁর সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইবেন?

অধ্যাপক মামুন বলেন, অভিযোগ থাকলে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, বিচার চাইতে হবে, ন্যায়ের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে—কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার কোনো বৈধতা নেই। যারা ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, তাঁদের তো আরও বেশি সংযত, দায়িত্বশীল ও পরিণত আচরণ করার কথা। অন্য কেউ উত্তেজিত হলে তাঁদের দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতি শান্ত করা, সহিংসতা থামানো—উস্কে দেওয়া নয়।

ঢাবি অধ্যাপক মামুন আরো বলেন, আজ প্রশ্নটা তাই শুধু কোনো শিক্ষক বা কোনো ছাত্রকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটা আমাদের রাষ্ট্রবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং সভ্যতার মানদণ্ড নিয়ে। আমরা কি সত্যিই আইনের শাসনের পথে হাঁটতে চাই, নাকি ক্রমে এমন এক অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে শ্রদ্ধা, যুক্তি ও ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে নেয় ভয়, হিংসা আর প্রতিশোধ? এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সময় আর নেই।

“A society that does not respect its teachers is a society that has already begun to decay.”

— Bertrand Russell. মনে রাখবেন যে সমাজ শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজের অবক্ষয় শুরু হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার