বিজ্ঞাপন
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: বিপ্লব যুদ্ধ ও রাষ্ট্রদর্শনের ৩ দশকের গল্প
ড. আজিজুল আম্বিয়া
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৮ এএম
বিজ্ঞাপন
ইরানের রাজনীতি বোঝার জন্য একজন মানুষকে বুঝতে হয়। তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা নন, বরং এমন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাতা, যার কেন্দ্রে আছে বিপ্লবের স্মৃতি, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ। তার নেতৃত্বে ইরান এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় আদর্শ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
১৯৮৯ সালে যখন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি মারা যান, তখন অনেকেই ভাবেননি যে খামেনি এত দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। কারণ তখন তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে হয়তো তিনি এই পদে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি নন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এমন এক নেতৃত্ব গড়ে তোলেন, যা শুধু প্রতীকী নয়, বাস্তব ক্ষমতার ভিত্তিতেও দৃঢ়।
খামেনির রাজনৈতিক চিন্তার মূল উৎস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধ-এর দিকে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত। সেই সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যুদ্ধকালীন বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠোর বাস্তবতা তার রাজনৈতিক মনোভাবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা ইরানের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল। কারণ অনেক পশ্চিমা দেশ প্রকাশ্য বা পরোক্ষভাবে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন-কে সমর্থন দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকেই খামেনির মধ্যে একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি হয় যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসের চেয়ে প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ইরানকে সব সময় বাহ্যিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC)। প্রথমদিকে এটি ছিল বিপ্লব রক্ষার জন্য গঠিত একটি বাহিনী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে। খামেনির রাষ্ট্রদর্শনে নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার একটি উপাদান।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে। এর প্রতিক্রিয়ায় খামেনি “প্রতিরোধ অর্থনীতি” ধারণা সামনে আনেন। তার যুক্তি ছিল সহজ। বাইরের চাপ কমাতে হলে দেশকে ভেতর থেকে শক্তিশালী হতে হবে। তাই প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হয়।
তবে এই পথ একেবারে মসৃণ ছিল না। ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। সেই সময় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। পরে ২০২২ সালে নারীদের অধিকার এবং সামাজিক স্বাধীনতার দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। এসব আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়, যা ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে।
খামেনির নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিতে তার অবস্থান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই কঠোর। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর চাপ বাড়ায়, তখন তেহরান নিজেকে একটি প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে একদিকে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব বাড়ছে, অন্যদিকে অন্য শক্তিগুলোও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। ফলে ইরানের পাশে বিভিন্ন সময় কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সমর্থন দেখা গেছে রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়া-এর মতো দেশগুলোর কাছ থেকে। যদিও এই সমর্থনের পেছনে প্রত্যেক দেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরেকটি বড় উপাদান হলো ইসরাইল। ইরান ও ইসরাইলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতাপূর্ণ। এই দ্বন্দ্ব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।
এদিকে বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেক সময় নতুন প্রশ্নও তৈরি করছে। যেমন, ভেনিজুয়েলা-কে ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বা বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ। এসব ঘটনা অনেক দেশের নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগায় যে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য কোথায় যাচ্ছে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে খামেনির নেতৃত্বকে দেখা দরকার। তার শাসন শুধু একটি ব্যক্তির রাজনৈতিক যাত্রা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার কৌশলও। তিনি বিশ্বাস করেন, বিপ্লবের আদর্শ ধরে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও নতি স্বীকার করা যাবে না।
তবে বাস্তবতা হলো, ইরানের সমাজও দ্রুত বদলাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম নতুন সুযোগ, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। এই প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে এই দ্বন্দ্ব কীভাবে সমাধান হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান উত্তেজনা অনেক সময় মানুষকে আশঙ্কিত করে তোলে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ মনে করেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে বড় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও ইতিহাস দেখায়, এমন উত্তেজনার মধ্যেও কূটনীতি অনেক সময় নতুন পথ খুলে দেয়।
সব মিলিয়ে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বকে এক লাইনে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি একদিকে বিপ্লবের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে যুদ্ধের স্মৃতি থেকে গড়ে ওঠা একটি নিরাপত্তা-নির্ভর রাষ্ট্রদর্শন। একই সঙ্গে এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন একটি দেশ আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং পরিবর্তনশীল বিশ্ব রাজনীতির মধ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চেষ্টা করছে।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে হয়তো ভবিষ্যতে খামেনির যুগকে মূল্যায়ন করা হবে এই প্রশ্ন দিয়ে: তিনি কি শুধু একটি বিপ্লবকে রক্ষা করেছেন, নাকি একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন। সময়ই তার উত্তর দেবে।লেখকঃ ড.আজিজুল আম্বিয়া,আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গবেষক ।
বিজ্ঞাপন