Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?

Icon

ড. আজিজুল আম্বিয়া

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ১০:৫২ এএম

এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?

বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ যেন এক দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গাজাকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেটি কেবল একটি ভূখণ্ডের সংঘাত নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে: এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে পরিণত হয়। ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। শহর, অবকাঠামো, হাসপাতাল, স্কুল—কিছুই এই সংঘাতের বাইরে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের তীব্রতা কখনো কমেছে, কখনো বেড়েছে; মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতির কথাও উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধের আগুন পুরোপুরি নিভে যায়নি।

এই যুদ্ধকে শুধু গাজার যুদ্ধ বললে ভুল হবে। কারণ এর প্রতিধ্বনি এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে শোনা যাচ্ছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের উত্তেজনা, ইরানের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষ সংঘাত, ইয়েমেন ও লোহিত সাগর ঘিরে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এক জটিল নিরাপত্তা সংকটে আটকে গেছে।

যুদ্ধের বিস্তৃত মানচিত্র

প্রথমে মনে করা হয়েছিল এটি কেবল ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি সংঘাত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের পরিধি অনেক বড় হয়ে গেছে। গাজায় যুদ্ধ চলার পাশাপাশি উত্তর সীমান্তে লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলও পাল্টা আঘাত করেছে।

একই সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও শক্তির মধ্যে যে অঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু বছর ধরে চলছিল, এই যুদ্ধ সেটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে এই সংঘাত এখন একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে একটি ছোট ঘটনা থেকেও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চলের সংঘাতগুলো খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সামরিক শক্তি বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা

যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল হামাসকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সামরিকভাবে পুরোপুরি নির্মূল করা খুবই কঠিন। আফগানিস্তান, ইরাক বা অন্য অনেক সংঘাতই দেখিয়েছে যে সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না।

অন্যদিকে হামাসও ইসরায়েলকে সামরিকভাবে পরাজিত করার মতো শক্তি অর্জন করতে পারেনি। ফলে এই সংঘাত এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে কেউই স্পষ্ট জয় পাচ্ছে না, আবার যুদ্ধ পুরোপুরি শেষও হচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। বহু সংঘাত বছরের পর বছর ধরে চলেছে, কখনো থেমেছে, আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই যুদ্ধও হয়তো একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার অংশ হয়ে থাকবে।

গাজার মানবিক বিপর্যয়

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। গাজা এখন সেই কঠিন বাস্তবতার প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

বহু মানুষ নিহত হয়েছে, অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট গাজাকে একটি বড় মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান না হলে এসব উদ্যোগ স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে না।

বিশ্ব রাজনীতির প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কখনোই কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়। এখানে সবসময় বড় শক্তিগুলোর প্রভাব থাকে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র। অন্যদিকে ইরান অঞ্চলটির বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে।

এই শক্তির ভারসাম্য পুরো সংঘাতকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় স্থানীয় সমস্যা বড় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে যায়। ফলে যুদ্ধের সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব রাজনীতির এই বাস্তবতা গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক কূটনীতি সক্রিয় থাকলেও এখনো এমন কোনো রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়নি যা স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারে।

সমাধানের প্রধান বাধা

এই সংঘাতের মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলছে—একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন এবং একটি নিরাপদ ইসরায়েল।

কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা কী হবে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

এই প্রশ্নগুলোর সমাধান ছাড়া যুদ্ধের প্রকৃত শেষ দেখা কঠিন।

ইতিহাসের শিক্ষা

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেখায়: এখানে যুদ্ধ দ্রুত শুরু হয়, কিন্তু শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, লেবাননের সংঘাত, ইরাক যুদ্ধ—সবই দেখিয়েছে যে সামরিক বিজয় প্রায়ই স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে না।

বরং দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমঝোতাই সংঘাত কমানোর একমাত্র কার্যকর পথ। কিন্তু সেই সমঝোতা তৈরি করতে সময় লাগে, সাহস লাগে এবং সবচেয়ে বেশি লাগে পারস্পরিক আস্থা।

মধ্যপ্রাচ্যে এই আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা।

তাহলে শেষ কোথায়?

এই যুদ্ধের শেষ হয়তো খুব দ্রুত আসবে না। যুদ্ধবিরতি হতে পারে, নতুন আলোচনার পথ খুলতে পারে, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। কিন্তু স্থায়ী শান্তি তখনই সম্ভব যখন মূল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি হবে।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রাধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করা ছাড়া এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি কল্পনা করা কঠিন।

যুদ্ধের ইতিহাস বলছে, বন্দুকের গুলি থামলেই যুদ্ধ শেষ হয় না। মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং বঞ্চনার সমাধান না হলে সংঘাত আবার ফিরে আসে।

তাই মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের শেষ কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। হয়তো এই যুদ্ধ থামবে কোনো একদিন। কিন্তু সত্যিকারের সমাপ্তি তখনই আসবে, যখন ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমাধান একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে।

তার আগে পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ছায়া পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়া কঠিন। লেখকঃ ড.আজিজুল আম্বিয়া, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গবেষক ।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার