Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

মতামত

বিচার বিভাগ, বার নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংকট

Icon

ড. আজিজুল আম্বিয়া

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০২:২৩ এএম

বিচার বিভাগ, বার নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংকট

বিজ্ঞাপন

স্বাধীন মতের আইনজীবীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখা: বিচার বিভাগের জন্য কী বার্তা বহন করে?

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা বর্তমানে শুধু রাজনৈতিক চাপ বা জনআবেগের মুখোমুখি নয়; বরং আইন পেশার অভ্যন্তরেও ক্রমবর্ধমান বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন আইনজীবী সমিতি ও বার নির্বাচনে স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের পক্ষের আইনজীবীদের নানাভাবে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা, মনোনয়ন বাতিল, প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি কিংবা অঘোষিত রাজনৈতিক বাছাইয়ের অভিযোগ দেশের আইনি অঙ্গনে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ, বিচারকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য স্লোগান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত প্রচারণা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পদত্যাগ এই সংকটের প্রতীকী ঘটনা হয়ে ওঠে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই পরিস্থিতি বিচারকদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে যে রাজনৈতিক আবহ এবং সংগঠিত জনচাপ থেকে বিচার বিভাগ পুরোপুরি মুক্ত নয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু আদালত যদি রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া বা “মব জাস্টিস”-এর আশঙ্কার মধ্যে পরিচালিত হয়, তবে আইনের শাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মতো একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করার আলোচনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একটি দলকে নিষিদ্ধ করা কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও তৈরি করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা প্রতিনিধিত্বের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া যদি এমন নীতির দিকে এগিয়ে যান যেখানে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সাংবিধানিক পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে বরং রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।

অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতিনিধিদের সংসদে জায়গা তৈরি হওয়া এবং একইসঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একটি ঐতিহাসিক দলকে নিষিদ্ধ করার প্রবণতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বাস্তবতা তৈরি করছে।

গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই ইচ্ছা অবশ্যই সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনের শাসনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতে হয়। অন্যথায় ন্যায়বিচার প্রতিশোধে রূপ নিতে পারে, আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যায়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বার কাউন্সিল ও আইনজীবী সমিতিগুলো কেবল পেশাজীবী সংগঠন নয়; এগুলো বিচার বিভাগের সহায়ক সাংবিধানিক শক্তি। একজন বিচারক যেমন আদালতের স্বাধীনতার প্রতীক, তেমনি একজন আইনজীবী নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের প্রতিনিধি। ফলে আইনজীবীদের স্বাধীন অংশগ্রহণ সীমিত করা মানে পরোক্ষভাবে বিচারপ্রাপ্তির সাংবিধানিক পরিবেশকে সংকুচিত করা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Amnesty International বহুবার তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল বিচারকদের স্বাধীনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আইনজীবীদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে Reporters Without Borders (RSF) বাংলাদেশে মতপ্রকাশের সংকুচিত পরিবেশ ও রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বিচারিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।

সাম্প্রতিক বার নির্বাচনে যেসব আইনজীবীকে “স্বাধীনতার পক্ষের” বা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা কয়েকটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করে।

প্রথমত, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ নাগরিকের সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। ৩৮ অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক ও পেশাগত সংগঠনে অংশগ্রহণের অধিকার দেয়। যদি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কারণে কোনো আইনজীবীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়, তবে তা সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো “ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার রিপ্রেজেন্টেশন” বা অবাধ প্রতিনিধিত্ব। আইনজীবী সমিতির নির্বাচন যদি সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ হারায়, তাহলে আইন পেশা ধীরে ধীরে দলীয় আনুগত্যনির্ভর কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিচার বিভাগের ওপরও পড়ে, কারণ ভবিষ্যতের বিচারপতি, অ্যাটর্নি, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার আইনজীবীদের বড় অংশ এই বার রাজনীতি থেকেই উঠে আসে।

তৃতীয়ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু আদালতের ভেতরের বিষয় নয়; বরং আদালতের বাইরের পেশাগত সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যদি আইনজীবীরা মনে করেন যে ভিন্নমত প্রকাশ করলে তারা পেশাগতভাবে বঞ্চিত হবেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভিত্তিক সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে আদালতে স্বাধীনভাবে যুক্তি উপস্থাপন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলায় দাঁড়ানোর সাহস কমে যেতে পারে।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে একটি “কনফরমিটি-ভিত্তিক” বিচার কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কেবল রাষ্ট্রসমর্থিত বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষরাই নিরাপদভাবে আইন পেশায় সক্রিয় থাকতে পারবেন? যদি এমন বাস্তবতা তৈরি হয়, তবে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গণতন্ত্রে আদালত ও বার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং ন্যায়বিচারের দুটি অপরিহার্য স্তম্ভ। বিচারক স্বাধীন হলেও আইনজীবী যদি স্বাধীন না থাকেন, তাহলে বিচারব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। কারণ আদালত সত্য খুঁজে পায় মূলত স্বাধীন যুক্তি, বিতর্ক ও প্রতিপক্ষের অবস্থান শুনে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-কে রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে কোণঠাসা করার অভিযোগ উঠছে, তখন একইসঙ্গে আইন পেশায় ভিন্নমতের প্রতিনিধিদের দূরে রাখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক বহুমতের জন্য আরও বড় সংকেত বহন করে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া-এর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। কারণ রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ভিন্নমত নিরাপদ থাকে, আদালত ভয়মুক্ত থাকে এবং আইনজীবীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত না হন।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আদালতের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি আইন পেশার বহুমত ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্র রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় বিচার বিভাগ ধীরে ধীরে সাংবিধানিক আশ্রয়স্থল থেকে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

লেখক: আজিজুল আম্বিয়া, গবেষক ও কলাম লেখক। 

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার