দেশে ফেরা নিয়ে তারেকের পোস্ট ঘিরে তোলপাড়
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০২:০৯ এএম
হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই সময় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে জল্পনা-কল্পনার ঢেউ উঠেছে। আলোচনার কেন্দ্রে একটি সহজ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন, লন্ডনে নির্বাসনে থাকা পুত্র বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কি দেশে ফিরবেন? আর যদি না ফেরেন, তার কারণ কী?
তারেক রহমানের একটি সংক্ষিপ্ত, সতর্ক শব্দচয়নে লেখা সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের পর এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘যেকোনো সন্তানের মতো, এই সংকটকালে আমিও মায়ের স্পর্শ অনুভব করতে চাই।’ তবে তিনি যোগ করেন, অন্য সবার মতো তার কাছে ‘কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা’ নেই। তিনি এও বলেন, ‘এই সংবেদনশীল বিষয়ে’ বিস্তারিত কিছু বলতেও তার সীমাবদ্ধতা আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কয়েকটি বাক্য দুটি সমান্তরাল ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। একটি হলো- গুরুতর অসুস্থ মায়ের পাশে থাকার জন্য পুত্রের আবেগঘন তাড়না। অন্যটি দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া একজন রাজনীতিবিদের কৌশলগত বিবেচনা। বিবৃতিটি ব্যক্তিগত যন্ত্রণার ইঙ্গিত দিলেও, তাতে ছিল কিছু অনুল্লিখিত রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার আভাস। ফলে প্রশ্ন উঠছে: তার প্রত্যাবর্তনে আসলে কী বা কে বাধা দিচ্ছে?
আইনি আশ্বাস বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
খালেদা জিয়ার দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্য এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার আবেগময় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, একজন সন্তানের দ্রুত দেশে ফেরাটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এখন জটিল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, কূটনৈতিক সতর্কতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথে কোনো আইনি বাধা নেই। আইন মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তিনি সব মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। তাই তিনি দেশে ফিরতে স্বাধীন।
সর্বশেষ, শনিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আবারও অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। প্রেস সচিব জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিধিনিষেধ বা আপত্তি নেই। একই দিন সন্ধ্যায় পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, ‘দেশে ফিরলে তারেক রহমানের নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি নেই।’
তবুও তারেক রহমান দেশে ফেরেননি। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি আশ্বাস এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এই যে ফারাক, সেখানেই লুকিয়ে আছে অজানা উপাদান। সেটি হতে পারে নিরাপত্তা উদ্বেগ, রাজনৈতিক দুর্বলতা, কিংবা কৌশলগত দ্বিধা। কেউ কেউ তার এই ফিরতে না পারা বা ফিরতে না চাওয়ার পেছনে একটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ছোঁয়াও খুঁজে পাচ্ছেন।
পুরোনো ‘মুচলেকা’ও লন্ডনে থাকার সুবিধা
দেশের নির্বাচন-পূর্ববর্তী অনিশ্চয়তার মধ্যে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং দলীয় দিকনির্দেশনার ওপর পড়বে। বহু পর্যবেক্ষকের কাছে, এটি এখন আর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ‘রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের হিসাব-নিকাশ’।
এই বিতর্কের কারণে ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার একটি বিতর্কিত নথি নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। জানা যায়, চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার শর্ত হিসেবে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর একটি মুচলেকায় সই করেছিলেন। যৌথবাহিনী এই মুচলেকা তখন স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল।
বর্তমানে সেই মুচলেকার দাপ্তরিক গুরুত্ব কতটা, তা স্পষ্ট নয়। সরকার বা বিএনপি কেউই এর বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করেনি। এতে মুচলেকাটি এখনো রাজনৈতিক পটভূমিতে সক্রিয় থাকতে পারে বলে সন্দেহ উসকে দিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের যুক্তি, তারেক রহমান যদি ফিরতে চান, তাহলে এমন আমলাতান্ত্রিক বাধা সম্ভবত কার্যকর হবে না।
প্রায় ১৮ মাস আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরেও তারেক রহমান লন্ডন থেকেই বিএনপির কৌশল নির্ধারণ করে চলেছেন। এতে প্রশ্ন জাগে যে, শারীরিক দূরত্ব কি তাকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে? যেমন- দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা বা আলোচনার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা?
বর্তমানে তারেক রহমান আইনিভাবে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী নন। ফলে ব্রিটিশ আইনে অন্যদেশ ভ্রমণে তার কোনো বাধা নেই। আইনগতভাবেই তিনি ঢাকা আসার জন্য ফ্লাইটে উঠতে পারেন। তবুও দেশে ফেরার বিষয়ে ‘বিস্তারিত ব্যাখ্যার সুযোগ সীমিত’-তার এই মন্তব্যকে কূটনৈতিক সতর্কতা হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো অনুল্লিখিত ‘রেড লাইন’-এর উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
দলের প্রত্যাশা সামলানোর কৌশল
তারেক রহমানের এই বার্তাটি বিএনপির ভেতরে প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেও দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়। কিছু কর্মী বিশ্বাস করেন, তার ফিরে আসা মাত্রই দল আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে। কিন্তু জ্যেষ্ঠ নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, হুট করে ফিরে আসা সংবেদনশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা, আইনি দুর্বলতা সামাল দেওয়া এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির হিসেব। দ্রুত পরিবর্তনশীল নির্বাচন পরিস্থিতিতে, তারা আশঙ্কা করছেন যে, তারেক রহমানের উপস্থিতি ঢাকায় নতুন অনিশ্চয়তা আনতে পারে, দলের অবস্থানকে শক্তিশালী নাও করতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, তার মন্তব্য একাধিক উদ্দেশ্য সাধন করে। দলের কর্মীদের প্রত্যাশা প্রশমিত করা, সতর্কতার ইঙ্গিত দেওয়া এবং পুনর্নিশ্চিত করা যে তার প্রত্যাবর্তনের সময়টি কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ।
তারেক রহমানের সমর্থকদের জন্য পরিস্থিতিটি গভীরভাবে আবেগপূর্ণ। একজন পুত্র তার গুরুতর অসুস্থ মাকে দেখতে পারছেন না। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির বৃহত্তর উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে। যেখানে নেতারা প্রায়ই আইনি ঝুঁকি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মতো হুমকির মুখে কাজ করেন।
সবকিছুর ওপর ঝুলে থাকা প্রশ্নটি স্পষ্ট, তারেক রহমান কি কেবল তখনই দেশে ফিরবেন যখন বিএনপির ক্ষমতায় ফেরার একটি স্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হবে—তার আগে নয়?
তার ‘সংকট’ শব্দটি ব্যক্তিগত পারিবারিক ট্র্যাজেডি এবং জাতীয় অনিশ্চয়তার মুহূর্ত—দুটিকেই ধারণ করে। এটি অতীতের রাজনৈতিক কারসাজির কথা মনে করিয়ে দেয়, যার মধ্যে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ ছিল, যা একসময় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দু’জনকেই রাজনীতি থেকে অপসারণের চেষ্টা করেছিল। আজ বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, অন্য কোনো অদৃশ্য সমীকরণ কি বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে আবারও নিয়ন্ত্রণ করছে?