মানসিক অশান্তির অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে— বাস্তব প্রেক্ষাপটের বাইরে অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি বেশি টেনশনে থাকা। অর্থাৎ দুশ্চিন্তায় থাকা। কারণ চিন্তাভাবনার সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক রোগের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন চিন্তাগুলো অতিরিক্ত হয়ে যায় কিংবা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, সেটি দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। আর তখনই এটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্ট্রেস কিংবা মানসিক চাপ মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্ট্রেসের কারণে মাথাব্যথা, পেটে যন্ত্রণা, ঘুম না হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, মানসিক চাপ কিন্তু আপনার খাদ্যাভ্যাসের ওপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। সে কারণে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা দেয়।
আমরা যখন কোনো কারণে মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করে থাকি, তখন আপনার আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। তখন আপনার চকোলেট কিংবা পিৎজার মতো খাবার খেতে ইচ্ছে করে। আবার কখনো কিছুই খেতে মন চায় না।
স্ট্রেস কেন আমাদের ক্ষুধার ওপর প্রভাব ফেলে এবং এ সমস্যা কীভাবেই বা কাটিয়ে উঠতে পারি আমরা? এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্ট্রেস সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রাজিতা সিনহা বলেছেন, কোনো কঠিন এবং বিহ্বল হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে যখন আপনার মনে হতে থাকে— এখন আর কিছুই করার নেই, তখনই শরীর ও মন যে প্রতিক্রিয়া দেয় সেটিই হলো স্ট্রেস।
সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক রাজিতা সিনহা বলেন, আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি, উদ্বেগ এবং শরীরের পরিবর্তন, যেমন— তীব্রতর খিদে বা তেষ্টা পাওয়ার মতো ঘটনা মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে সক্রিয় করে তোলে। আর হাইপোথ্যালামাস হচ্ছে— আমাদের মস্তিষ্কের মোটরের মতো আকারের একটি ক্ষুদ্রাংশ।
তিনি বলেন, আর 'অ্যালার্ম সিস্টেম' আমাদের শরীরের প্রতি কোষের ওপর কাজ করে ও অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো হরমোনকে সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে আমাদের হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। স্বল্পমেয়াদে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কিছু ক্ষেত্রে সহায়কও হতে পারে। আপনাকে বিপদ থেকে বাঁচতে বা একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ক্ষতিকারক হতে পারে বলেও জানিয়েছেন সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক রাজিতা সিনহা । তিনি বলেন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন, ঘুমের সমস্যা এবং ওজন বৃদ্ধি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, স্ট্রেসের কারণে ক্ষুধায় প্রভাব পড়ে। কারণ স্ট্রেস কখনো কখনো ক্ষুধা বাড়িয়ে তুলতে পারে, আবার কখনো তা একেবারে দমিয়েও ফেলতে পারে। এমনটি ঘটার কারণ— আমাদের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সিস্টেম, পেট ও অন্ত্র এবং মস্তিষ্কের মধ্যে সরাসরি যোগ রয়েছে।
সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক রাজিতা সিনহা বলেন, মানসিক চাপ ভেগাস নার্ভের কার্যকলাপকে দমিয়ে দিতে পারে। এই স্নায়ু ব্রেনস্টেম থেকে পেট পর্যন্ত গেছে। এর কাজ পাকস্থলী থেকে ব্রেনে সিগন্যাল পাঠিয়ে জানানো— পেট কতটা ভরা আছে এবং শরীরের কতটা এনার্জি প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, আপনার শরীর যখন মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়, তখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ইনসুলিনকে স্বল্পসময়ের জন্য কম মাত্রায় কার্যকর করে তোলে।
প্রকৃতপক্ষে গ্লুকোজ ব্যবহার হওয়ার পরিবর্তে রক্তে থেকে যায়, যা রক্তে শর্করার মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে।
এটা দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রেসের সঙ্গে লড়তে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে, যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং ইনসুলিন প্রতিরোধ দেখা যেতে পারে, যা ওজন বৃদ্ধি বা ডায়াবেটিসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে ডা. স্টোরোনি বলেন, মানসিক চাপে থাকাকালীন স্ট্রেস ইটিং বা উদ্বেগজনিত খাওয়া কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে— আগাম পরিকল্পনা করা, যাতে ব্যস্ত সময়ে আমরা অতিরিক্ত না খেয়ে ফেলি।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে আমি পরামর্শ দেব— ঘুমের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে। এর কারণ ঘুম মানসিক চাপের প্রতি প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তিনটি অঙ্গকে আবার রিসেট করে দেয়।
তিনি আরও বলেন, ঘুম মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামে সেই ক্ষুদ্র অংশ, পিটুইটারি ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলোকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনেস যার ফলে স্ট্রেস হরমোন তৈরি হওয়া বন্ধ হয়।
ডা. স্টোরোনি বলেন, ঘুমের ঘাটতি হলে সব ধরনের খাওয়ার ইচ্ছা— মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। এর কারণ ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্কের আরও শক্তির প্রয়োজন পড়ে। তিনি বলেন, এক্সারসাইজ করলে স্ট্রেস থেকে রিল্যাক্সড অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষমতাও বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও বাড়ে।
মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে এমন সময় যদি আসন্ন হয় তাহলে এই সাধারণ বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ দিলে স্ট্রেসে থাকাকালীন অতিরিক্ত খাওয়া এড়ানো যেতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।