সবার জন্য উপযোগী ‘গোল্ডেন ব্লাড’ তৈরির চেষ্টা বিজ্ঞানীদের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৩৩ পিএম
বিশ্বে প্রতি ৬০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র একজনের শরীরে পাওয়া যায় অত্যন্ত বিরল এক ধরনের রক্ত– আরএইচ নাল, যাকে বিজ্ঞানীরা অনেক সময় ‘গোল্ডেন ব্লাড’ নামে ডাকেন। এ রক্ত শুধু চিকিৎসায় নয়, জটিল গবেষণাতেও অমূল্য হওয়ায় এখন ল্যাবরেটরিতে এর বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
রক্ত সঞ্চালন আধুনিক চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটালেও সবাই সঠিক রক্তের মিল না পাওয়ায় এই সুবিধা পান না। বিশেষ করে যাদের রক্তের গ্রুপ বিরল, উপযুক্ত রক্ত পাওয়া তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। আরএইচ নাল রক্তধারীদের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে—সারা বিশ্বে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০ জনের শরীরে এই রক্ত শনাক্ত হয়েছে।
এ কারণেই চিকিৎসকরা আরএইচ নাল রক্তধারীদের নিজেদের রক্ত দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দেন। তবে দুষ্প্রাপ্য হলেও এই রক্ত সব ধরনের আরএইচ গ্রুপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় চিকিৎসাবিশ্বে এর মূল্য অপরিসীম।
রক্তের গ্রুপ কীভাবে নির্ধারিত হয়
রক্তের ধরণ নির্ভর করে লোহিত রক্তকণিকার ওপর থাকা বিশেষ উপাদান—অ্যান্টিজেনের ওপর। ভুল অ্যান্টিজেনযুক্ত রক্ত শরীরে প্রবেশ করলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে আক্রমণ করে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
রক্তের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ হলো এবিও এবং রেসাস (আরএইচ)।
— এ গ্রুপে থাকে এ অ্যান্টিজেন
— বি গ্রুপে বি
— এবি–তে দুইটিই
— আর ও গ্রুপে থাকে না কোনো অ্যান্টিজেন
এ ছাড়া রক্তে রয়েছে আরও অসংখ্য অ্যান্টিজেন—২০২৪ সালের অক্টোবরে পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ৪৭ ধরনের রক্ত গ্রুপ ও ৩৬৬টি অ্যান্টিজেন। তাই ও নেগেটিভকেও পুরোপুরি সার্বজনীন ডোনার বলা সঠিক নয়।
বিশ্বজুড়ে আরএইচ অ্যান্টিজেনের বৈচিত্র্য এত বেশি যে সঠিক মিল পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তবে আরএইচ নাল রক্তে ৫০টির কোনো আরএইচ অ্যান্টিজেনই নেই, ফলে এটি প্রায় সব আরএইচ গ্রুপের মানুষের শরীরে গ্রহণযোগ্য।
আরএইচ নাল রক্তের উৎপত্তি ও ল্যাবে তৈরি
গবেষণা বলছে, জেনেটিক মিউটেশনের কারণে লাল রক্তকণিকায় থাকা আরএইচএজি প্রোটিনের গঠনে পরিবর্তন আসায় আরএইচ নাল রক্ত তৈরি হয়। এই প্রোটিন বিকৃত হলে অন্যান্য আরএইচ অ্যান্টিজেন প্রকাশ পায় না।
২০১৮ সালে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাশ টোয়ে ও সহকর্মীরা ল্যাবে আরএইচ নালের অনুকরণ তৈরি করেন। তারা সিআরআইএসপিআর-সিএএস৯ জিন এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্তের পাঁচটি প্রধান অ্যান্টিজেন—এবিও, আরএইচ, কেল, ডাফি ও জিপিবি—নিষ্ক্রিয় করেন। ফলে উৎপন্ন লোহিত কণিকাগুলো সাধারণ রক্তের গ্রুপের পাশাপাশি বিরল গ্রুপের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের গবেষকেরাও স্টেম সেল ব্যবহার করে কাস্টমাইজড বিরল রক্ত তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ব্যাপক পরিমাণে এসব রক্ত উৎপাদন করা এখনও দূরের লক্ষ্য। ল্যাবে লোহিত রক্তকণিকার পরিপক্বতা, বৃদ্ধিসহ প্রযুক্তিগত নানা বাধা এখনো রয়ে গেছে।
বর্তমানে ‘রিস্টোর’ নামের বিশ্বের প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দাতার স্টেম সেল থেকে ল্যাবে তৈরি রক্ত স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে পরীক্ষা করা হচ্ছে। যদিও এতে কোনো জিন এডিট করা হয়নি, তবুও মানবদেহে ট্রায়ালের পর্যায়ে পৌঁছাতে লেগেছে এক দশক।
অধ্যাপক টোয়ে বলছেন—রক্তদাতার প্রয়োজন ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে বিরল রক্তধারীদের জন্য যদি ল্যাবে বেশি পরিমাণ রক্ত তৈরি করা সম্ভব হয়, সেটি হবে বড় অগ্রগতি।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন—জিন এডিটিং ছাড়াও একসময় ল্যাব-উৎপাদিত বিরল রক্ত ব্যাংক গড়ে তোলা যাবে। তবে ক্লিনিক্যাল অনুমোদন পেতে সময় লাগবে আরও।
বিশ্বে সবচেয়ে বিরল ‘গোল্ডেন ব্লাড’ জীবন বাঁচানোর বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি একদিন হয়তো প্রায় সবার জন্য উপযোগী সার্বজনীন রক্ত উৎপাদনের পথ খুলে দেবে—কিন্তু এখনো অনেক পথ বাকি।